হারানো-নিখোঁজ শিশুর ব্যাপারে নীরবতার দিনগুলো আমরা শেষ বলতে চাই

সিআইডি প্রধান মো. ছিবগাত উল্লাহ বলেছেন, কোনো পরিবারের ছোট্ট শিশু হারিয়ে বা নিখোঁজ কিংবা অপহৃত হলে অভিভাবক, স্বজনদের ভীষণ ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আমাদের প্রত্যয়, আর একটি বাচ্চাকেও যেন হারিয়ে যেতে না হয়। হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাদের ব্যাপারে নীরবতার দিনগুলো আমরা শেষ বলতে চাই।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশ-এর যৌথ উদ্যোগে মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) চালু হলো ‘মুন অ্যালার্ট’। এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে টোল ফ্রি হেল্পলাইন ১৩২১৯।
সকালে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি সদর দপ্তরে নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের দ্রুত উদ্ধার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন’ (এমইউএ) জাতীয় জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা ও টোল ফ্রি হেল্পলাইন ১৩২১৯ এর উদ্বোধন করেন অতিরিক্ত আইজিপি সিআইডি প্রধান মো. ছিবগাত উল্লাহ।
এসময় উপস্থিত ছিলেন বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের পরিচালক মো. নুরাননবী, অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশের কনভেনার সাদাত রহমান, সিটি ব্যাংকের এমডি ও সিইও মাশরুর আরেফিন, গণমাধ্যম ও উন্নয়নকর্মী দীপ্তি চৌধুরী এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (শিশু সুরক্ষা শাখা) মোহা. কামরুজ্জামান।
সিআইডি প্রধান বলেন, একটি পরিবারের ছোট্ট একটি বাচ্চা যখন হারিয়ে যায় কি বেদনা নিয়ে পিতা-মাতা বেঁচে থাকে। আমরা এরকম অনেকে দেখেছি ছোটোবেলায় তার বাচ্চাটা হারিয়ে গেছে। এই দম্পতি একদম বৃদ্ধ হয়ে গেছে, তারা কিন্তু এখনো পথচেয়ে বসে আছে। তার সন্তানটি ঘরে ফিরে আসবে। এরকম কিন্তু আমাদের দেশে অনেক আছে।
তিনি বলেন, আমরা দেখি প্রতিনিয়তই এরকম শিশু অপহরণ বা নিখোঁজের মামলা হচ্ছে, বাচ্চা অপহরণ, হসপিটাল থেকে চুরি হয়ে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কিন্তু শিশু মিসিং আছে।
তিনি আরো বলেন, একটি বাচ্চা যখন হারিয়ে যায় তখন আমরা অনেকেই কিন্তু এটা রিপোর্ট করি না, থানায়ও যাচ্ছি না, মামলাও করছি না। অনেকে বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য মনে করেন একটু খুঁজে দেখি। কিন্তু নিজেরা খোঁজার চেষ্টা করে এখানে আমরা সমস্যাটা করে ফেলি।
বিশ্বব্যাপী নিখোঁজ শিশু উদ্ধার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে জরুরি সতর্কবার্তা ব্যবস্থার ধারণাটি গুরুত্ব পায় ১৯৯৬ সালে। যুক্তরাষ্ট্রে শিশু অ্যাম্বার হ্যাগারম্যান অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর। এরই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রে চালু হয় অ্যাম্বার অ্যালার্ট ব্যবস্থা, যা পরে ইউরোপের ৩২টি দেশ এবং মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, চীন, নাইজেরিয়া, কেনিয়া ও পাকিস্তানসহ বহু দেশে নিজস্ব আইনগত ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়-এই সময়ে দ্রুত ও যাচাইকৃত সতর্কবার্তা জারি করা গেলে শিশুকে নিরাপদে উদ্ধারের সম্ভাবনা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালে সিলেটে পাঁচ বছর বয়সী শিশু মুনতাহা আক্তার নিখোঁজ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাসহ বিভিন্ন অভিজ্ঞতা নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে একটি দ্রুত, সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে তোলে। এই বাস্তবতার আলোকে বাংলাদেশ পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের মিসিং চিলড্রেন সেল-এর নেতৃত্বে এবং জিরো মিসিং চিলড্রেন প্ল্যাটফর্ম-এর কারিগরি ও সমন্বয় সহায়তায় প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে ‘মুন অ্যালার্ট’ ব্যবস্থা, যেখানে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সমন্বয় সহায়তার জন্য অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশ টিম যুক্ত হয়েছে।
‘মুন অ্যালার্ট’-এর আওতায় কোনো শিশু নিখোঁজ বা অপহৃত হওয়ার যুক্তিসংগত আশঙ্কা দেখা দিলে, যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে সিআইডি কর্তৃক জরুরি সতর্কবার্তা জারি করা হবে। এই সতর্কবার্তা অফিসিয়াল ওয়েবপোর্টাল ও মোবাইল অ্যাপের পাশাপাশি অনলাইন ও অফলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল বিলবোর্ড, প্রয়োজন অনুযায়ী মোবাইল এসএমএস/সেল ব্রডকাস্টিং এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর মাধ্যমে প্রচার করা হবে, যাতে সাধারণ জনগণ দ্রুত তথ্য দিয়ে উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে। পুরো প্রক্রিয়ায় শিশুর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।
নিখোঁজ শিশু সংক্রান্ত যে কোনো তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯, মিসিং চিলড্রেন সেল-০১৩২০০১৭০৬০ অথবা টোল-ফ্রি হেল্পলাইন ১৩২১৯-এ জানানো যাবে। প্রাপ্ত তথ্য যাচাই, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও সতর্কবার্তা জারি, স্থগিত বা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব থাকবে সিআইডি-এর মিসিং চিলড্রেন সেল-এর ওপর। প্রয়োজন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম বা শিশু পাচারের আশঙ্কা দেখা দিলে ইন্টারপোল-এর মাধ্যমে ইয়েলো নোটিশ জারির ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হবে।
আন্তর্জাতিকভাবে অ্যাম্বার অ্যালার্ট পরিচালনাকারী সংস্থা ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়েটেড চিলড্রেন এবং মেটা (ফেসবুক)-এর সহযোগিতায়, সিআইডি ও জিরো মিসিং চিলড্রেন প্ল্যাটফর্ম-এর সমন্বয়ে এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, ‘মুন অ্যালার্ট’ চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশে নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে একটি রাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন, প্রযুক্তিনির্ভর ও সমন্বিত কাঠামো গড়ে উঠবে, যা শিশু সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গণমাধ্যমের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে সিআইডি প্রধান বলেন, একা বাংলাদেশ পুলিশ কিন্তু এটি করতে পারবে না। আর আরেকটি জিনিস আমরা বলতে চাই যে পুলিশের প্রতি যে একটি ভয়ের পারসেপশন আমরা এটিকে ভেঙে বেরিয়ে যেতে চাই। আমরা চাই বাচ্চারা যেন উন্নত বিশ্বের মতো পুলিশকে যেন আপন করে নিতে পারে। পুলিশকে যেন তার নির্ভয়ে কথাটি বলতে পারে।
জেইউ/জেডএস