নির্বাচন সামনে রেখে অন-অ্যারাইভাল ভিসায় কঠোর হচ্ছে সরকার

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষ্যে বিদেশি নাগরিকদের দেশে প্রবেশের ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখছে সরকার। নির্বাচনকে নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করার লক্ষ্যে বিদেশি নাগরিকদের স্পন্সরকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি, হোটেল বা আবাসস্থল এবং ফিরতি টিকিটসহ সামগ্রিক গতিবিধি নজরদারিতে রাখা হবে।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এ বিষয়ে সরকার একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও জারি করেছে। ঢাকা পোস্টের হাতে আসা নথি এবং দায়িত্বশীল সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে বিদেশি নাগরিকদের ভিসা ও আগমন-প্রস্থানের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা সময়োপযোগী ও যৌক্তিক। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষায় ভিসা প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি আরোপ আইনসম্মত হলেও, একই সঙ্গে বৈধ বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে যেন অযথা বিঘ্ন না ঘটে, সেই ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। এ ছাড়া সমন্বিত নজরদারি, স্বচ্ছ ভিসা প্রক্রিয়া ও তথ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হলে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনও সম্ভব হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের ভিসা ব্যবস্থাপনায় একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করা হচ্ছে। নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে বিদেশি পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মীদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন ও সুপারিশ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন চায়— নির্বাচনের সময় পর্যবেক্ষকরা স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করুন। একই সঙ্গে, দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিও যেন বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়টি মাথায় রেখে ভিসা প্রক্রিয়ায় সময়সীমা ও শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় কী আছে
সম্প্রতি নির্বাচন ইস্যুতে অন-অ্যারাইভাল ভিসা নিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ সংক্রান্ত বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, চলতি জানুয়ারির ২০ তারিখ থেকে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। এ ছাড়া, বিদেশি সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশে আগমনের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনকালে বিদেশি নাগরিকদের আগমন, অবস্থান ও প্রস্থানে যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে আগমনী ভিসাসহ (অন-অ্যারাইভাল ভিসা) অন্যান্য ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ‘ভিসা নীতিমালা ২০০৬’ ও পরবর্তী সময়ে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের শর্তাবলী যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন বা দূতাবাসগুলো সুনির্দিষ্ট ভিসা প্রদান করবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, আগমনী ভিসা বা অন-অ্যারাইভাল ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে আগমনের উদ্দেশ্য, স্পন্সরকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি, হোটেল বা আবাসস্থল এবং ফিরতি টিকিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষকে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হতে হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম, ব্যতিক্রম বা সন্দেহ দেখা দিলে ভিসা প্রদান করা যাবে না। একই সঙ্গে, বিদেশি সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশে আগমনের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

নির্দেশনায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬ পর্যবেক্ষণের জন্য আগত বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের জন্য ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষণ’ সম্বলিত সিলসহ আগমনী ভিসা প্রদান করা হবে। একই সঙ্গে, নির্বাচন কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে পর্যবেক্ষকদের ভিসা ফি মওকুফ করে অন-অ্যারাইভাল ভিসা দেওয়া যাবে।
এ ছাড়া, নির্দেশনায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ সব স্থল ও নৌ-বন্দরে বিদেশি নাগরিকদের ভিসা প্রদান, আগমন ও প্রস্থানের সময় নিয়োজিত স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন বা দূতাবাস, বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, স্পেশাল ব্রাঞ্চ এবং সব বন্দর থেকে বিদেশি নাগরিকদের ভিসা ও যাতায়াত সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রতিদিন নিয়মিতভাবে এক্সেল ফরম্যাটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের (বহিরাগমন অনুবিভাগ) ই-মেইলে পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ভিসা নীতিতে কেন এই কড়াকড়ি?
এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে বিদেশি নাগরিকদের চলাচল নিয়ে সরকারের এই নির্দেশনা সময়োপযোগী ও যৌক্তিক। নির্বাচনের সময় বিদেশি কূটনীতিক, পর্যবেক্ষক, সাংবাদিক ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতি স্বাভাবিক। তবে, এই সুযোগে কোনো অপশক্তি যেন দেশে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য ভিসা যাচাই প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, আগমনী ভিসার ক্ষেত্রে স্পন্সর, থাকার স্থান, আগমনের উদ্দেশ্য ও ফিরতি টিকিট যাচাই না করে ভিসা দিলে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে বিদেশি সামরিক বা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের আগমনের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে তিনি সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়ে বলেন, বিমানবন্দর, স্থল ও নৌ-বন্দরগুলোতে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান যত শক্তিশালী হবে, ততই ঝুঁকি কমবে। প্রতিদিন বিদেশি নাগরিকদের আগমন ও প্রস্থানের তথ্য এক্সেল ফরম্যাটে কেন্দ্রীয়ভাবে পাঠানোর নির্দেশনা নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করবে। স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে যেমন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের প্রবেশ প্রয়োজন, তেমনি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে তাদের ভিসা ব্যবস্থাপনাও হতে হবে নিয়ন্ত্রিত ও সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে।
বিদেশি বাহিনীর সদস্যদের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলকের সিদ্ধান্ত যথাযথ
সাবেক আইজিপি ও বাংলাদেশি কূটনীতিক নূর মোহাম্মদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমাদের ভিসা ও যাতায়াতসংক্রান্ত বিশেষ সুবিধা আছে। স্বাভাবিক সময়ে এসব ব্যবস্থার কারণে আগমন প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ থাকে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে বিদেশি নাগরিকদের ভিসা ও চলাচল ব্যবস্থাপনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনা নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে বিদেশি নাগরিকদের আগমন, অবস্থান ও প্রস্থানের তথ্য যদি সমন্বিতভাবে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারিতে না রাখা হয়, তবে তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আগমনী ভিসার ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য, স্পন্সর, আবাসস্থল ও ফিরতি টিকিট যাচাইয়ের যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন হলে অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি বা সন্দেহভাজনদের প্রবেশ অনেকাংশে ঠেকানো সম্ভব হবে। বিশেষ করে বিদেশি সামরিক বা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তটি যথাযথ।
নূর মোহাম্মদ আরও বলেন, বিমানবন্দর, স্থল ও নৌ-বন্দরগুলোতে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় যত শক্তিশালী হবে, ততই নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা কার্যকর হবে। প্রতিদিন বিদেশি নাগরিকদের ভিসা, আগমন ও প্রস্থানের তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হলে ঝুঁকি আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যেন বৈধ বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের কাজে অযথা বাধা সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে হবে। নিরাপত্তা ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ভিসা প্রত্যাখ্যান করতে পারে রাষ্ট্র, তবে থাকতে হবে লিখিত রেকর্ড
প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ভিসা নীতিমালা-২০০৬ এবং পরবর্তী সময়ে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনগুলো রাষ্ট্রকে ভিসা প্রদান, প্রত্যাখ্যান বা বাতিল করার পূর্ণ আইনগত ক্ষমতা দেয়।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা বা জনস্বার্থের প্রশ্নে আগমনী ভিসাসহ যেকোনো ধরনের ভিসা প্রত্যাখ্যান করা সম্পূর্ণ আইনসম্মত। তবে ভিসা প্রত্যাখ্যান বা বাতিলের সিদ্ধান্তটি যেন স্বেচ্ছাচারী না হয়, সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত রেকর্ড থাকা জরুরি। এতে ভবিষ্যতে কোনো আইনি প্রশ্ন উঠলে রাষ্ট্র তার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পারবে।
ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান আরও উল্লেখ করেন, নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে ভিসা প্রক্রিয়ায় বাড়তি সতর্কতা আরোপ করা সংবিধান ও প্রচলিত আইনের পরিপন্থী নয়। বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অংশ হিসেবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে।
এমএম/এমজে
