বিপ্লবের অগ্রভাগে থাকলেও এখনো নিরাপত্তাহীনতায় নারীরা

আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট অঙ্গীকার এবং নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে নারী নেতৃত্ব ও লৈঙ্গিক সমতা সুনিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে হবে।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘নারী নেতৃত্ব, লৈঙ্গিক সমতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ শীর্ষক সংলাপে বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ নারী নেতৃত্ব জোটের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি নাসিম ফেরদৌস, রাজনীতিবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী, বাংলাদেশ নারী উদ্যোক্তা অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাসরিন ফাতেমা আউয়াল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. শাইখ ইমতিয়াজ, ট্রান্স ফেমিনিস্ট ও অধিকার কর্মী হো চি মিন ইসলাম, রাষ্ট্র সংস্কার ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি লামিয়া ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদের সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট ফারুক হাসান, রবি আক্সিয়াটা কর্পোরেট সেলস ম্যানেজার ও ট্যাগরা বিডির প্রতিষ্ঠাতা তাহরিম খান জাহিদ, খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী মিনহাজুল আলম, অ্যাডভোকেট এলিনা খান, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) সভাপতি জিল্লুর রহমান প্রমুখ।
নাসিম ফেরদৌস বলেন, আমি যখন কর্মজীবনে প্রবেশ করি, তখন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে নারীদের ব্যাপক অনুপস্থিতি লক্ষ্য করি। যখন নারীদের নেতৃত্বে না থাকার বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হতো, তখন সাধারণত অজুহাত দেওয়া হতো যে তারা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত নয়। সংবিধানে নারীদের পূর্ণ অধিকার দেওয়া থাকলেও বাস্তবে কেউ তাদের সেই অধিকার দিতে চায় না। এমনকি নারীরা যখন নিজেদের অধিকতর যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করে, তখনও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তাদের পথ আটকে দেওয়া হয়।
নাজমুল হক প্রধান বলেন, পরিবারের সঙ্গে নারীর সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। নারীদের স্বাধীনতা এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ ও ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ বেড়েছে। যদি আমরা প্রকৃত উন্নয়ন চাই, তবে নারীদের যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্বে বিকাশের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা দিতে হবে। আসন্ন নির্বাচনের পূর্বেই আমাদের চিন্তাভাবনার পরিধি আরও বিস্তৃত করতে হবে, তবেই নারীর নেতৃত্ব সুদৃঢ় হবে।
শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশে নারী-পুরুষের সমতা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ চিত্রই সমাজে প্রতিফলিত হয়। তৃণমূল পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন এখনো কম এবং দলগুলোতে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। যতদিন রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট আসন বা সুযোগ নিশ্চিত না করবে, ততদিন প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা, পৌরসভা ও জেলা স্তরের প্রতিটি কমিটিতে অন্তত ৪০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে; অন্যথায় কোনো কমিটি গঠন করা যাবে না। বর্তমানে নারী কমিশনকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে এবং এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর নেই। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদেরও মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে। দেশের ৫১ শতাংশ নারী এবং তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী যদি উন্নয়নের অংশ হতে পারে, তবেই দেশের প্রকৃত উন্নতি হবে।
শামা ওবায়েদ আরও উল্লেখ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী প্রার্থীদের প্রতিনিয়ত হয়রানি করা হচ্ছে, অথচ নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে উদাসীন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নারীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, যা আসন্ন নির্বাচনে কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে হবে। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সবাই সমান সুযোগ ও বিচার পায়।
নাসরিন ফাতেমা আউয়াল বলেন, নারীদের প্রতিবন্ধকতা শুরু হয় পরিবার থেকে; যেখানে অনেকে চান না নারীরা কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হোক। এছাড়া সামাজিক প্রতিকূলতাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে তহবিলের সংকট রয়েছে, ব্যাংক থেকে নারীরা সহজে ঋণ পায় না এবং প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে অনেক নারী ব্যবসা শুরু করতে পারছেন না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিশ্চিত করতে হবে যেন নারীরা সব ধরনের সুযোগ পায়।
তিনি আরও প্রস্তাব করেন, সংসদে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তি সহজতর করতে হবে। আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া ‘জাতীয় নারী নেতৃত্ব একাডেমি’ এবং মেন্টরশিপ কোর্স চালু করা জরুরি। কর্মজীবী নারীদের জন্য ডে-কেয়ার ব্যবস্থা, সমান ছুটি ও সমমজুরি নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় বাজেটে ‘জেন্ডার রেসপন্সিভ’ বরাদ্দ রাখতে হবে এবং আগামী নির্বাচনের পর নারীদের উন্নয়ন নিয়ে সরকারকে বিশেষভাবে পরিকল্পনা করতে হবে।
ড. সৈয়দ মো. শাইখ ইমতিয়াজ বলেন, আমাদের সমাজে একটি গভীর শ্রেণিবিভাগ বিদ্যমান এবং গত ৩০ বছরে নারীরা আগের চেয়ে আরও বেশি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছেন; যা মূলত নীতিগত ব্যর্থতা। প্রায় ৭০ শতাংশ নারী বর্তমানে নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না, যার মূল কারণ হলো নারীদের অধিকারকে উপেক্ষা করা। রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের কেবল ব্যবহার করছে। জুলাই বিপ্লবে নারীরা প্রথম সারিতে থাকলেও বর্তমানে তাদের অবস্থার কাঙ্ক্ষিত কোনো উন্নতি হয়নি।
ফারুক হাসান বলেন, যখন মানুষ নিজেদের ‘সংখ্যালঘু’ বলে চিহ্নিত করে, তখন তা উদ্বেগজনক। কারণ এটি মূলত গভীর নিরাপত্তাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। আসলে নারী বা পুরুষ নয়, আমাদের সবার মূল পরিচয় হওয়া উচিত মানুষ। বর্তমানে রাজনীতির বাইরেও স্বজনপ্রীতি বা আত্মীয়তাবাদ বৃদ্ধি পাওয়া একটি গুরুতর সমস্যা। আজ অনেক নারী সফলভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাই ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে নারীদের নেতৃত্ব বা ক্ষমতায়ন প্রতিরোধের চেষ্টা করা উচিত নয়। দুঃখজনকভাবে, কিছু মানুষ ধর্মীয় গ্রন্থের ভুল ব্যাখ্যা ও ভিত্তিহীন গল্পের মাধ্যমে নারী অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করছে।
তাহরিম খান জাহিদ বলেন, নারীদের ক্ষেত্রে সমতার ধারণাটি একটি জটিল বিষয়। প্রকৃত সমতা মানে এই নয় যে পুরুষ ও নারী জৈবিকভাবে এক; বরং এটি তাদের বিশেষ প্রয়োজনগুলো চিহ্নিত করা এবং তা মোকাবিলা করার ওপর গুরুত্বারোপ করে। একটি শক্তিশালী সহায়তা ব্যবস্থা অপরিহার্য, যাতে নারীরা তাদের সাফল্য ও প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ও সুযোগ লাভ করতে পারে।
সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় নারীদের বিশাল অবদান কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করা যায় না। তাদের ভূমিকা কেবল তথ্য সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। যে মায়েরা নিজের সন্তানদের যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন, সেই নারীরাই আজ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া—বিশেষ করে সংসদ থেকে বারবার বাদ পড়ছেন।
প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন খাতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব ২৬ শতাংশ এবং লৈঙ্গিক বৈষম্যও প্রায় সমপরিমাণে কমেছে। সমতার ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হলেও এটি অত্যন্ত ধীর একটি প্রক্রিয়া এবং এর সুফল সব স্তরের নারীর কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
এলিনা খান বলেন, নেতৃত্বের অভাব প্রায়ই পারিবারিক পর্যায় থেকে শুরু হয় এবং পরবর্তী সময়ে তা জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রকৃত নেতৃত্ব তৈরির জন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অপরিহার্য। এই পরিবর্তনের সূচনা হওয়া উচিত পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। যদি নারীদের এমন পরিবেশে বড় করা হয় যা তাদের সম্ভাবনাকে সমর্থন করে, তবে তাদের জন্য নেতৃত্বের আসনে বসা এবং সমাজে অবদান রাখা অনেক সহজ হয়ে যাবে।
হো চি মিন ইসলাম বলেন, আমরা নারীদের স্বীকৃতি ও মর্যাদা নিয়ে কথা বলছি, কিন্তু বিপ্লবের পর তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। আমাদের সমাজে প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক মানসিকতার অভাব রয়েছে।
লামিয়া ইসলাম বলেন, আমাদের দেশের সংস্কৃতি এমন যে, মুক্তিযুদ্ধের কথা বললে সাধারণত কেবল পুরুষের অবদানের কথা মনে পড়ে। অথচ মুক্তিযুদ্ধে নারী গোয়েন্দারা যেভাবে তথ্যের আদান-প্রদান করেছিলেন, তা অবিস্মরণীয়। জুলাই আন্দোলনেও নারীদের ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু বিপ্লবের পর তাদের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। আমাদের নারীদের সঠিক স্থানে সঠিক কথা বলতে হবে। তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থায় নারীদের নিয়ে যেসব নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, তার বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে হবে। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন এবং নীতিনির্ধারণে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলেই নারীর অধিকার সুরক্ষিত হবে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের সভাপতি জিল্লুর রহমান।
এনআই/এমজে