পান্থকুঞ্জ ধ্বংস করে এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ সড়কের কাজ চলমান রাখা উদ্বেগের

ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে লক্ষাধিক মানুষের একমাত্র বিনোদন ও জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো পান্থকুঞ্জ পার্ক ধ্বংস করে ব্যক্তিগত গাড়িকেন্দ্রিক এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজ চলমান রাখায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার গণপরিবহনভিত্তিক বিআরটি প্রকল্প বাতিল করেছে। অথচ পরিবেশবিধ্বংসী ব্যক্তিগত গাড়িভিত্তিক এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ সড়কের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে জনগণের মতের তোয়াক্কা না করেই। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের বলে মনে করে আইপিডি।
পান্থকুঞ্জ পার্ক ধ্বংস করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ না করার বিষয়ে হাইকোর্টের পূর্বতন নির্দেশনা ছিল। গত সেপ্টেম্বর মাসে পরিবেশ আন্দোলনকারীদের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট আবারও এক্সপ্রেসওয়ের কাজ বন্ধ করার যে স্থগিতাদেশ দিয়েছিল, তা উপেক্ষা করেই এক্সপ্রেসওয়ের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। আদালতে পূর্ণাঙ্গ শুনানির পূর্বেই তাড়াহুড়ো করে এবং দ্রুতগতিতে এই নির্মাণকাজের মাধ্যমে ইতোমধ্যে পান্থকুঞ্জ পার্ক মৃতপ্রায় অবস্থায় উপনীত হয়েছে। এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাসমূহের নীরবতাকেও বিস্ময়কর বলে মনে করে আইপিডি।
বিগত সরকারের আমলে নেওয়া পান্থকুঞ্জ পার্ক ও হাতিরঝিলের সংরক্ষিত জলাধারে এফডিসি থেকে পলাশী পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ সড়ক প্রকল্প বাতিলের দাবিতে পরিবেশকর্মীরা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে আন্দোলন করলেও অন্তর্বর্তী সরকার এ নিয়ে কোনো ধরনের সংবেদনশীলতা দেখায়নি। পরিবেশ আন্দোলনকারী, পরিকল্পনাবিদ, পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনায় বসার আগ্রহ পর্যন্ত প্রকাশ করেনি।
এই সরকারের উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা বারংবার বলার চেষ্টা করেছেন, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ তথা পিপিপি প্রকল্পের কোনো ধরনের পরিবর্তন বা সংশোধন করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। অথচ ১২ বছর চলার পর এবং প্রকল্পের ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর সড়কে বাস্তবায়নাধীন বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিল করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে এক্সপ্রেসওয়ের কেবল একটি সংযোগ সড়ক বাতিল করা নিয়ে সরকারের দ্বিচারিতা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। বিআরটি একটি বাসভিত্তিক গণপরিবহন প্রকল্প হওয়া সত্ত্বেও তা বাতিল করা হয়েছে, অথচ ব্যক্তিগত গাড়ি-নির্ভর এক্সপ্রেসওয়ে নিয়ে বিদেশি ঠিকাদারদের স্বার্থ সুরক্ষা করতে সরকার গণআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রতারণা করছে। আবার ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এক্সপ্রেসওয়েকে আরও ব্যবহারবান্ধব করতে চারটি নতুন র্যাম্প যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে ঢাকা শহরে বাসভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও বাস রুট রেশনালাইজেশন উদ্যোগের তেমন কোনো সফলতা দেখাতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এফডিসি থেকে পলাশী পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণের উদ্যোগের কারণে হাতিরঝিল জলাধার ও পান্থকুঞ্জ পার্কের পরিবেশ ইতোমধ্যে ধ্বংসের সম্মুখীন। পাশাপাশি এই সংযোগ সড়ক তৈরি করা হলে কারওয়ান বাজার-বাংলামোটর-কাঁঠালবাগান-কাঁটাবন-নীলক্ষেতসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সামগ্রিক পরিবেশ ও পরিবহন ব্যবস্থা সীমাহীন সংকটে পড়বে। ধনীদের বিলাসী ব্যক্তিগত গাড়ি এক্সপ্রেসওয়ের ওপর দিয়ে নির্বিঘ্নে চলে যাবে, অথচ নিচের বিদ্যমান রাস্তা আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে। ঢাকার অন্য যেসব এলাকায় ফ্লাইওভার বা উড়াল সড়ক নির্মিত হয়েছে, সেসব এলাকার নিচের সড়কগুলো বহুলাংশে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে অত্র এলাকার মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের ব্যবহারের বিদ্যমান সড়কটি আরও সংকুচিত হয়ে যাবে।
আইপিডি মনে করে, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও জনস্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাকে অস্বীকার করেই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। ব্যক্তিগত গাড়ি-ভিত্তিক অবকাঠামোকে প্রাধান্য দিয়ে পৃথিবীর কোথাও যানজটের সমাধান হয়নি। ফলে অবিলম্বে পান্থকুঞ্জ ধ্বংস করে এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ বন্ধ করার পাশাপাশি পরিবেশধ্বংসকারী ও ব্যক্তিগত গাড়ি-ভিত্তিক ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এফডিসি থেকে পলাশী পর্যন্ত সংযোগ সড়ক বাতিল করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে আইপিডি।
এএসএস/এমজে