‘বৃষ্টির মতো গ্লাস ভেঙে পড়ার শব্দে ঘুম ভাঙে’

রাজধানীর উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের একটি সাততলা আবাসিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় অগ্নিকাণ্ডে ছয়জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের তিন সদস্য রয়েছেন।
পুলিশের ধারণা, আগুনের সূত্রপাত ঘটে ভবনের দোতলার একটি রান্নাঘর থেকে। রান্নাঘরে বৈদ্যুতিক গোলযোগ কিংবা গ্যাস লিকেজের কারণে আগুনের সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
ভয়াবহ এ ঘটনায় কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে ফেরেন চতুর্থ তলার বাসিন্দা শিবলু। তিনি সেখানে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে থাকেন।
শিবলু জানান, ঘটনার সময় ঘুমাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ ওপর তলা থেকে বৃষ্টির মতো গ্লাস ভেঙে পড়ার শব্দে ঘুম ভাঙে তার। পরিবার নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করলে আটকে পড়েন তিনি। পরে ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় ভবন থেকে সপরিবারে নিরাপদে বের হয়ে আসেন।

শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে ঘটনার বর্ণনা দেন তিনি।
শিবলু বলেন, যখন আগুনের ঘটনা ঘটে তখন আমরা ঘুমাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে ওপর থেকে গ্লাস ভেঙে পড়ার শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। আগুন যে লেগেছে এটা বুঝতে পারিনি। শব্দ পাচ্ছি ওপর তলায় গ্লাসের মতো কি যেন ভেঙে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে ফ্লোরজুড়ে পড়ছে বৃষ্টির মতো। তখনই আমার ঘুম ভেঙে যায়। সবাইকে নিয়ে দৌড়ে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু এত ধোঁয়া, ধোঁয়া দেখে দরজা বন্ধ করে দিয়ে ভেতরে নিরাপদে থাকার চেষ্টা করি। পরে ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় আমরা নিরাপদে বের হই।
তিনি আরও বলেন, আল্লাহর রহমতে আমরা সবাই সুস্থ আছি।

ভবন ঘিরে রেখেছে সিআইডির ক্রাইম সিন
সরেজমিনে দেখা গেছে, সাততলা ভবনটির দোতলা ও তিন তলা ধোঁয়ার কালিতে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। ভেঙে গেছে জানালা ও ব্যালকনির গ্লাস। ভবনের সামনের সড়কে ভিড় করেছেন এলাকার উৎসুক জনতা। ভেতরে অবস্থান করছেন পুলিশ ও সিআইডির সদস্যরা। একইসঙ্গে উৎসুক জনতার প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে সিআইডির ক্রাইম সিন টেপ দিয়ে ভবনের প্রধান ফটক ঘিরে রাখা হয়েছে।
রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাতের শঙ্কা
এদিকে, দুপুরে নিজ কার্যালয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিক আহমেদ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, আমরা সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে সংবাদ পাই আমাদের থানার নিকটবর্তী চারটা-পাঁচটা ভবন দূরত্বে একটি ভবনে আগুন লেগেছে। থানার নিকটবর্তী হওয়ায় আমরা এই অগ্নিকাণ্ডের দ্রুত সংবাদ পাই এবং আমরা নিজেরাই দ্রুত ফায়ার সার্ভিসকে ঘটনা সম্পর্কে জানাই। সংবাদ পাওয়ার পর খুব দ্রুত ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস আসে এবং আমাদের যতগুলো মোবাইল টিম আশপাশে ছিল তারাও ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর উদ্ধার কাজ শেষ হতে সকাল আনুমানিক ১০টা ২০ মিনিট পর্যন্ত লাগে। আমরা এখন পর্যন্ত ৬ জনের মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছি। এর মধ্যে তিনজনের মরদেহ রয়েছে উত্তরার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে, আরেকজনের মরদেহ উত্তরায় অন্য আরেকটি হাসপাতালে। আর সর্বশেষ যে মৃত্যুর সংবাদ পাই, সেই মরদেহটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এ ঘটনায় সর্বমোট কতজন আহত হয়েছেন তা জানতে আমাদের পুলিশের বিভিন্ন টিম কাজ করছে।

আগুনের সূত্রপাত নিয়ে তিনি বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত যতটুকু তথ্য তদন্তে পেয়েছি যে ভবনটির দোতলায় থাকা একটি রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। সেটি ওই রান্নাঘরের বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে হতে পারে, নয়ত গ্যাস লিকেজের কারণে হতে পারে; তবে এ বিষয়ে আমরা এখনো নিশ্চিত নই।
এর আগে শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) সকালে ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, শুক্রবার সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়ক এলাকায় অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে এমন খবরে সকাল ৭টা ৫৪ মিনিটে উত্তরা ফায়ার স্টেশন থেকে দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটগুলো সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে।
প্রায় আধা ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। পরে সকাল ১০টার দিকে আগুন সম্পূর্ণভাবে নির্বাপণ করা হয়।
এমএসি/এসএসএইচ