ঢাকাসহ দেশের নগর এলাকার বাসযোগ্যতা ক্রমান্বয়ে কমছে

গণঅভ্যুত্থানের পর নগর এলাকাগুলোকে বাসযোগ্য, ন্যায্য ও টেকসই করার ব্যাপারে রাষ্ট্র ও সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নেবে, এটা নাগরিকদের প্রত্যাশা ছিল। ঢাকাসহ দেশের নগর এলাকার বাসযোগ্যতা ক্রমান্বয়ে কমছে। সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) কর্তৃক অনলাইনে আয়োজিত পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিশ্লেষণী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ছিল ‘২০২৫ সালে বাংলাদেশের নগর এলাকার পরিকল্পনা, উন্নয়ন, পরিবেশ ও ন্যায্যতা: নাগরিকদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’।
বক্তারা বলেন, ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা ও পৌর এলাকার নগর উন্নয়ন, ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও পরিবেশের ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যবসায়ীদের চাপে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপের পরিবর্তন করেছে। নদী-খাল, জলাশয়-জলাভূমি দখলকারী কিংবা নগর এলাকায় বিপজ্জনক শিল্প-কারখানার মাধ্যমে বায়ু দূষণকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। শহরের যানজট-জলজট-শব্দ দূষণ দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি।
তারা বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিল না। এলাকার সমস্যা সমাধানে সরকার পাড়া-মহল্লার মানুষ কিংবা কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করতে পারেনি। বিশেষত নগরে নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক এলাকায় বসবাসরত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আরও বেড়েছে। তথাপি বিগত বছর ২০২৫-এ অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় নগর নীতি এবং স্থানিক পরিকল্পনা অধ্যাদেশ অনুমোদন দিয়েছে, যা আগামী দিনগুলোতে নগর এলাকার ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে। আগামী নির্বাচিত সরকারকে বড় প্রকল্পে মনোযোগ না দিয়ে নগর এলাকার সমস্যা সমাধানে কার্যকর পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ, উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা ও জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে আইপিডির পরিচালক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও আমরা সামগ্রিকভাবে দেশের জাতীয় পর্যায়ের স্থানিক পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে পারিনি। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাবে যা তৈরি হয়েছে, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে প্রয়োজনীয় অগ্রগতি নেই। ফলে সারাদেশে একটিও পরিকল্পিত শহর নেই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফরহাদুর রেজা বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে পরিকল্পনা বিষয়ক প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বড় একটি ফাঁক রয়ে গেছে। ড্যাপের সংশোধনের জন্য ঢাকা শহরে জনঘনত্ব বেড়ে যাবে, তাতে শহর আরও স্থবির হয়ে পড়বে। রাজউক উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের কাজ থেকে সরে গিয়ে আবাসন বাণিজ্যে লিপ্ত আছে।
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষক এবং আইপিডি রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল আকাশ বলেন, আমাদের নগর বিষয়ক সমস্যাগুলো ভুল নীতিকৌশলের কারণে সৃষ্ট। পরিবেশ আইন ভঙ্গকারী ব্যক্তিরা সহজেই অল্প ক্ষতিপূরণে দায়মুক্তি পায়। ফলে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীরা পরিবেশসংক্রান্ত আইনের কোনো তোয়াক্কা করেন না।
আইপিডি সদস্য প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ সজীব বলেন, রাজউকসহ রাষ্ট্রের নগর সংস্থাগুলো বিএনবিসি কোড-এর এনফোর্সমেন্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে। নাগরিক জীবনের ঝুঁকি কমাতে পরিকল্পনা ও ভবন নির্মাণ সংশ্লিষ্ট আইনের বাস্তবায়নে সরকার সফল হতে পারেনি।
পরিকল্পনাবিদ সাজিদ ইকবাল বলেন, ঢাকাভিত্তিক সরকার দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। আইনি কাঠামো, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন না থাকলে কোনো পরিকল্পনা কার্যকর হবে না। বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা করা সম্ভব হয়নি।
আইপিডির গবেষণা সহযোগী জিনিয়াস জান্নাত বলেন, বস্তিবাসী যারা আছেন, তাদের জীবনমান উন্নয়নে সেভাবে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এখনো দীর্ঘসূত্রতা রয়ে গেছে।
আইপিডির গবেষণা সহযোগী কাজী তাসনিয়া তাবাসসুম বলেন, পরিকল্পনাসংশ্লিষ্ট বিদ্যমান আইন প্রয়োগে সরকারের সফলতা কম। যেসব নগর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সমন্বয় বাড়াতে হবে।
অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান।
এএসএস/এসএসএইচ