নারী, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিষয়ে ১০ দফা সুপারিশ

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ১০ দফা সুপারিশ করেছে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি।
৭১টি নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত প্ল্যাটফর্মটির উদ্যোগে মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে দেওয়া স্মারকলিপির সুপারিশসমূহ তুলে ধরার লক্ষ্যে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মডারেটর ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। সুপারিশসমূহ উপস্থাপন করেন অ্যাকশন এইডের উইমেন রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইক্যুইটির লিড মরিয়ম নেছা।
নির্বাচন কমিশনের কাছে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির ১০ দফা সুপারিশ
১. দেশের সব প্রান্তের সব নাগরিক যাতে নির্বিঘ্নে, স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন পূর্ববর্তী, নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নারীসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক নারী-পুরুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
২. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সব ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীদের প্রতি হয়রানি, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও সহিংস আচরণ প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
৩. নির্বাচনি ব্যয় সংকোচ করে ন্যূনতম নির্বাচনি ব্যয় নির্ধারণ করতে হবে এবং এ বিষয়ে কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে।
৪. স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫. নারী, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী যাতে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেদিকে দৃষ্টি রেখে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সুবিধাজনক স্থানে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।
৬. জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার জন্য নিরপেক্ষভাবে সব ধরনের সহায়তা করতে হবে। এক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
৭. নির্বাচনি প্রচারণায় ধর্মের ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।
৮. সব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৯. যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
১০. নির্বাচনি প্রচারণায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষদের হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনের মডারেটর বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্রে করে আমরা নির্বাচন কমিশন বরাবর যে স্মারকলিপি দিয়েছিলাম, আজ সংবাদ সম্মেলনে সেই স্মারকলিপিই উপস্থাপন করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনার জন্য নানা দিক থেকে নানা প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে নারী প্রার্থী বৃদ্ধির জন্য সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল এই নির্বাচনে মাত্র ৪.০৮ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, যা কাঙ্ক্ষিত নয়। আমরা ইতোমধ্যে সুপারিশমালা নির্বাচন কমিশনে পাঠিয়েছিলাম। সেখানে আমরা প্রতিবন্ধী প্রার্থীদের ভোটদানের সুযোগ বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করেছিলাম। যা নির্বাচন কমিশন আমলে নিয়েছে। এই একটা ইতিবাচক দিক বলে আমরা মনে করি।
সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন মডারেটর ডা. ফওজিয়া মোসলেম, অ্যাকশন এইডের মরিয়ম নেছা এবং ব্র্যাকের শাশ্বতী বিপ্লব।
প্রশ্নোত্তরকালে তারা বলেন, এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের যে সংখ্যা তা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচনে মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা, নারীর প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোভাব, পেশিশক্তি এবং অর্থের প্রভাবসহ ইত্যাদির প্রভাব রয়েছে। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই ৫ শতাংশ আসনে নারীর সমনোনয়ন দিতে চেয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এই সংখ্যা আরও কম। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন পদক্ষেপ নিতে পারতো বলে তারা উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলন ওয়াইডব্লিউসিএ অব বাংলাদেশ, এডাব, ব্র্যাক, অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, আইইডি, প্রাগ্রসর, স্টেপস টুয়াডর্স ডেভেলপমেন্ট, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি, কর্মজীবী নারী, ওয়ার্ল্ড ভিশন ও গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রতিনিধিবৃন্দ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেত্রীবৃন্দ, সম্পাদকমণ্ডলী এবং কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
জেইউ/এমজে