ভোটের রাজনীতিতে পরিবেশ কতটা গুরুত্ব পাবে, প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের তালিকায় পরিবেশ, বন ও জীববৈচিত্র্য কতটা গুরুত্ব পাবে—সে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশ ও শাসন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, উন্নয়ন ও ক্ষমতার রাজনীতিতে পরিবেশ বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্য, জলবায়ু সহনশীলতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার ওপর। নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশকে কেবল প্রতিশ্রুতির জায়গায় না রেখে বাস্তবায়নযোগ্য অঙ্গীকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বাংলাদেশ বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন ফেডারেশনের (বিবিসিএফ) উদ্যোগে আয়োজিত ‘জাতীয় ম্যানিফেস্টো ডায়ালগ—পরিবেশ, বন ও জীববৈচিত্র্য : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী অপরাধ’ শীর্ষক সংলাপে তারা এসব কথা বলেন।
সংলাপে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, পরিবেশ, শাসন ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন। এটি ছিল পরিবেশ-নিরাপত্তা ও নির্বাচনী রাজনীতির সংযোগ নিয়ে এক বিরল বহুদলীয় প্ল্যাটফর্ম।
সংলাপের সঞ্চালক ছিলেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিজিডি) নির্বাহী পরিচালক সাইদুল ইসলাম। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন বিবিসিএফ-এর সভাপতি ও প্রত্যাশীর পরিচালক ড. নাসির উদ্দীন।
কী-নোট বক্তব্যে ড. নাসির উদ্দীন বলেন, ‘পরিবেশ, বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য, জলবায়ু সহনশীলতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আইন ও প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও পরিবেশগত ব্যর্থতার মূল কারণ হলো রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাব। আসন্ন নির্বাচনের ইশতেহারে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী অপরাধ প্রতিরোধে স্পষ্ট, পরিমাপযোগ্য ও বাস্তবায়নযোগ্য অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানাচ্ছি।’
এ সময় বিভিন্ন প্যানেলিস্ট বক্তারা সংলাপে বক্তব্য দেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জোবায়ের বলেন, পরিবেশগত সমস্যার সমাধানে রাজনৈতিক নেতাদের সদিচ্ছা ও জাতীয় ঐক্য অপরিহার্য। আইন থাকলেও শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবেশ উন্নয়ন সম্ভব নয়।
ন্যাচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্টের (ন্যাকম) নির্বাহী পরিচালক ড. মঞ্জুরুল হান্নান খান বলেন, পরিবেশ কোনো একক রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়। এটি পুরো জনগণের সমস্যা। এই সংকট মোকাবিলায় একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা জরুরি।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, কিছু প্রার্থীর পরিবেশ বিষয়ক কমিটমেন্ট আমাদের আশাব্যঞ্জক করেছে। তবে এটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে দলীয় ইশতেহারে অগ্রাধিকার হিসেবে দেওয়া উচিত।
ন্যাপের (ভাসানী) সভাপতি মোসতাক আহমেদ ফরায়েজী সংলাপে মন্তব্য করেন, পরিবেশ ধ্বংস ও বন্যপ্রাণী অপরাধকে আলাদা কোনো পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখা যাবে না। এটি শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি কাঠামোগত সংকট।
ইয়ুথ নেট গ্লোবালের নির্বাহী পরিচালক সোহানুর রহমান বলেন, নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিবেশ, বন ও জীববৈচিত্র্যকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। জনগণের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলো কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন— শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সহ-সভাপতি কবির আহমেদ, জবান সম্পাদক রেজাউল করিম রনি, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী, সেটার ফর গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. আবদুল ওয়াহাব, ওয়ান ওয়ান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক হাবিবুর রহমান, বিবিসিএফের সাধারণ সম্পাদক মো. আরাফাত রহমান, নির্বাহী সম্পাদক মো. জুয়েল রানা, বাংলাদেশ ওয়াইল্ড লাইফ অ্যান্ড নেচার ইনিশিয়েটিভের সভাপতি মো. আহসান হাবীব শিপলু এবং একাডেমি অব অ্যানালিটিক্স অ্যান্ড রিসার্চের ডিরেক্টর অব লিগ্যাল অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স ফজলে রাব্বী।
উপস্থিত সবাই একমত পোষণ করেন, পরিবেশ দূষণ, বন দখল, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও বন্যপ্রাণী অপরাধ রোধে শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশকে কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে একটি টেকসই, নিরাপদ এবং ভবিষ্যৎমুখী বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব।
সংলাপের পার্টনার সংগঠন হিসেবে ছিলেন সিজিডি, স্টার্টআপ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (স্যাব), মুক্তির বন্ধন ফাউন্ডেশন, প্রত্যাশী, এসবিএসএস, ডব্লিউএইচআরও এবং একাডেমি অব অ্যানালিটিক্স অ্যান্ড রিসার্চ (এএআর)।
টিআই/এমএন