মোরগ পোলাও থেকে পেস্তা শরবত, বৈচিত্র্যে ভরপুর চকবাজার

রমজান এলেই রাজধানীর পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক চকবাজার এলাকায় তৈরি হয় এক আলাদা আবহ। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই উপচে পড়া ভিড় দেখা যায় পুরান ঢাকার এলাকাজুড়ে। ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’, সুতি কাবাব, মোরগ পোলাও, হালিম থেকে শুরু করে পেস্তা শরবত—বাহারি পদের সমাহারে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ভিড় ও যানজট সত্ত্বেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ছুটে আসেন এই ঐতিহ্যবাহী বাজারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চকবাজারের ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ইফতার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদেরই একজন মো. সিরাজ। পাঁচ দশক ধরে ঝালমুড়ি বিক্রি করলেও রমজান এলেই তিনি বদলে ফেলেন চেহারা—বাহারি ইফতারির পসরা নিয়ে বসেন চকের আঙিনায়। এবার রমজানেও দৈনিক ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার ইফতার বিক্রি করছেন তিনি।

মো. সিরাজ মিয়া বলেন, এই ব্যবসা আমাদের বাবা-দাদার আমল থেকে চলে আসছে। আমরা সেই ধারাই ধরে রাখছি। রোজা এলে আলাদা প্রস্তুতি নিতে হয়।
তার মতে, শুধু লাভের হিসাব নয়—ঐতিহ্য ধরে রাখার দায়ও আছে তাদের ওপর। যে কারণে চকবাজারের বেশিরভাগ দোকানই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিচালিত।
ব্যবসায়ীদের দাবি, মুঘল আমল থেকে এই বাজারে ইফতারের আয়োজন হয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে আয়োজনের ধরন, বেড়েছে পদের সংখ্যা, কিন্তু ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা আছে।

আমিনুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ী জানান, তাদের পরিবার বহু বছর ধরে ইফতারি বিক্রি করছে। এই ঐতিহ্য আমরা ধরে রাখার চেষ্টা করছি। এটা শুধু ব্যবসা না, আমাদের পরিচয়।
চকবাজারের ইফতার মানেই বৈচিত্র্য। মোরগ পোলাও, গরুর কাবাব, চিকেন রোস্ট, বিফ হালিম, নেহারি, বোরহানি, দই বড়া, শাহী জিলাপি—তালিকা দীর্ঘ।
ইফতার বিক্রেতা সিরাজ মিয়া বলেন, গত বছর ৩০০ টাকায় বিক্রি করেছি, এবারও একই দাম রাখার চেষ্টা করছি। সব কিছুর দাম বাড়লেও আমরা ক্রেতাদের কথা চিন্তা করছি।

এবার নতুন সংযোজন হিসেবে বেশ আলোচনায় রয়েছে ‘কলকাতা পেস্তা বাজারের শরবত’। বিক্রেতাদের দাবি, এতে জাফরান, পেস্তা, কাজু, কাঠবাদাম ও মিনারেল ওয়াটার ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতি হাফ লিটার ২৪০ টাকা দাম হলেও ক্রেতাদের সুবিধা অনুযায়ী কিছু ছাড় দেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বিকেল ৪টার পর থেকেই চকবাজার ও আশপাশের এলাকায় যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। ইফতারের আগমুহূর্তে দোকানের সামনে তৈরি হয় দীর্ঘ সারি। অনেক সময় হাঁটাচলাও কঠিন হয়ে পড়ে।
আরিফুল হক নামে এক ক্রেতা বলেন, প্রতিবছরই এখান থেকে এসে ইফতার কিনি। বাচ্চারা খুবই পছন্দ করে। এখানকার স্বাদ আর পরিবেশের জন্যই আসি।

পরিবার নিয়ে আসা ক্রেতাদের সংখ্যাও চোখে পড়ার মতো। অনেকে আবার অফিস শেষে সরাসরি চলে আসেন এখানে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবারের বাজারে চাঁদাবাজির কোনো অভিযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও স্বাভাবিক রয়েছে। নির্বিঘ্নে চলছে কেনাবেচা। ব্যবসায়ী সিরাজ মিয়া বলেন, এবার পরিবেশ ভালো। সবাই শান্তিতে ব্যবসা করতে পারছি।
টিআই/এমএন