দুই সিবিএ নেতা কারাগারে, একজন লাপাত্তা, নিশ্চুপ যমুনা অয়েল কর্তৃপক্ষ

ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পরও যমুনা অয়েল কোম্পানির দুই শীর্ষ সিবিএ নেতার বিরুদ্ধে এখনো কোনো বহিষ্কার কিংবা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সংগঠনটির সভাপতি মো. আবুল হোসেন আট মাস ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ এয়াকুব দুই মাস ধরে কারাগারে থাকলেও তারা এখনো চাকরিতে বহাল রয়েছেন।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে কার্যকরী সভাপতি জয়নাল আবেদীন টুটুল লাপাত্তা থাকলেও তার বিরুদ্ধেও কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অতীতে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কর্মচারীদের সাময়িক বরখাস্তের নজির থাকলেও এই তিনজনের ক্ষেত্রে সেই পদক্ষেপ না নেওয়ায় আলোচনা তৈরি হয়েছে।
যমুনার শক্তিধর সিবিএ নেতা হিসেবে এই তিনজনের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তারা শ্রমিক লীগ করলেও পটপরিবর্তনের পর শ্রমিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে পরিচিত হতে থাকেন। আগস্ট বিপ্লবে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে তিনজনের বিরুদ্ধেই মামলা রয়েছে। এসব মামলায় আবুল হোসেন ও মোহাম্মদ এয়াকুব সম্প্রতি কারাগারে যান। তবে তাদের বিরুদ্ধে যমুনা অয়েল কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো ধরনের বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
এ বিষয়ে যমুনা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদ জানান, তিনজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ২০ জুলাই নগরের ইপিজেড থানার সিমেন্ট ক্রসিং এলাকা থেকে যমুনা অয়েল কোম্পানির শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. আবুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আন্দোলন চলাকালে সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
গত ১২ ডিসেম্বর নগরের ডবলমুরিং থানার আগ্রাবাদ এলাকা থেকে যমুনা অয়েল কোম্পানির শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ এয়াকুবকে গ্রেপ্তার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ডিবি। পরে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আন্দোলন চলাকালে সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাকেও গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। বর্তমানে দুজনই কারাগারে রয়েছেন।
জানা গেছে, যমুনা অয়েলের আলোচিত নেতা মোহাম্মদ এয়াকুব ১৯৯৭ সালে ৯৩৫ টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেন। পদোন্নতির পর এখন সবমিলিয়ে বেতন পান ৮৫ হাজার ১০০ টাকা। ২০০৯ সালে কোম্পানির লেবার ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন তিনি। এক বছর পর সাধারণ সম্পাদক হন। সেই থেকে তিনি এ পদে রয়েছেন। গত দেড় দশক এটি ছিল শ্রমিক লীগের সংগঠন।
অন্যদিকে দুদক সূত্রে জানা গেছে, অঢেল সম্পদের মালিক এয়াকুবের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করছে সংস্থাটি। তাদের প্রাথমিক তদন্তে এয়াকুবের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৪ সালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ২১ লাখ টাকায় ৬ শতাংশ জমি কিনেছেন এয়াকুব। ডবলমুরিং থানার আগ্রাবাদ এলাকায় নুরুন নাহার বেগমের সঙ্গে যৌথভাবে ৫০ লাখ টাকায় ৪ শতাংশ জমি কেনেন তার স্ত্রী মরিয়ম বেগম।
দুদক সূত্র বলছে, বোয়ালখালী উপজেলায় এয়াকুবের ১৪ শতাংশ, সাড়ে ১১ শতাংশ ও ১২ শতাংশের তিনটি জমি পাওয়া গেছে। আরও কিছু জমি আছে যৌথভাবে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকায় খুলশীর দামপাড়ায় ৪ হাজার ২০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট আছে তার। দলিলে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা দাম পাওয়া গেছে ফ্ল্যাটের।
এদিকে ব্রাজিল বাড়ির মালিক হিসেবে পরিচিত যমুনা অয়েল কোম্পানির চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী জয়নাল আবেদীন ওরফে টুটুল বর্তমানে কর্মস্থলে নেই। তার বিরুদ্ধে সরকারি জ্বালানি তেল চুরিসহ দুর্নীতি এবং অবৈধ আয়ে জমি, ফ্ল্যাটসহ বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় তার ছয়তলা বাড়িটির পুরো অংশে ব্রাজিলের পতাকা আঁকা রয়েছে। ফলকে লেখা আছে ব্রাজিল বাড়ি। ২০১৮ সালে ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালে বাড়িটিতে ঢাকায় নিযুক্ত ব্রাজিলের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত জোয়াও তাবাজার দে অলিভেইরা জুনিয়র গিয়েছিলেন। এরপর বাড়িটি ব্যাপক পরিচিতি পায়।
জয়নাল এক দশক ধরে যমুনা অয়েল কোম্পানি লেবার ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ইউনিয়নের কার্যালয় চট্টগ্রামে হলেও তিনি ফতুল্লার ডিপোতে ইউনিয়নের নামে একটি পৃথক কার্যালয় গড়ে তুলেছিলেন। বিগত সরকারের সময় নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ হন তিনি। গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানের পর তিনি লাপাত্তা হয়ে যান। এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর দশম অধ্যায়ে বলা হয়েছে, কোনো কর্মচারী দেনার দায়ে কারাগারে আটক থাকলে অথবা কোনো ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার হলে বা তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গৃহীত হলে, সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ আটক, গ্রেপ্তার বা অভিযোগপত্র গ্রহণের দিন থেকে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারবে।
আবুল হোসেন, মোহাম্মদ এয়াকুব ও জয়নাল আবেদীন টুটুলের ক্ষেত্রে এ আইনের বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে যমুনা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদ জানান, বিভাগীয় প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুতই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে যমুনা অয়েল কোম্পানির কর্মকর্তা শেখ কামাল হোসেন জানান, ১৯৯৯ সালে একটি ফৌজদারি মামলায় কোম্পানির চার কর্মচারী আবুল বাশার, শামসুল আলম মৃত এবং শফিউজ্জামান মন্টুসহ চারজন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। ১১ দিন পর তারা জামিনে মুক্তি পান। তবে গ্রেপ্তার হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।
এমআর/এসএসএইচ