ঢাকায় আসছেন পল কাপুর, জোর পাবে বাণিজ্য ও কৌশলগত অংশীদারত্ব

চলতি সপ্তাহে ঢাকা সফরে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর। বিএনপি সরকার গঠনের পর ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এটিই প্রথম উচ্চপর্যায়ের সফর হবে। যেখানে রাজনৈতিক বোঝাপড়ার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পল কাপুরের সফরটি রাজনৈতিক হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ যে বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে এই সফরে তা বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেবে ওয়াশিংটন।
তারা বলছেন, সফরে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা সমস্যা এবং আঞ্চলিক ইস্যু- বিশেষ করে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরান নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তাদের আলোচ্যসূচির অন্যতম বিষয় ছিল পল কাপুরের আসন্ন ঢাকা সফর।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই দিনের সফরে আগামী ৩ মার্চ ঢাকায় আসছেন মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সফরকালে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার বৈঠক করার কথা রয়েছে।
ঢাকার একটি কূটনৈতিক সূত্র বলছে, আগামী ৪ ও ৫ মার্চ ঢাকায় ব্যস্ত সময় পার করবেন পল। তিনি বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য, অর্থ, জ্বালানি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করতে পারেন তিনি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, পল কাপুর অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে ঢাকা সফরের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। পরে অবশ্য নির্বাচন সামনে দেখে সিদ্ধান্তে পরিবর্তন এনে ওয়াশিংটন জানায়, নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারের সময়ে তিনি বাংলাদেশ সফর করবেন। নিয়োগ পাওয়ার পর এটিই পলের প্রথম বাংলাদেশ সফর। এটি যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরের পাশাপাশি নতুন সরকার গঠনের পর কোনো বিদেশি প্রতিনিধিরও প্রথম বাংলাদেশ সফর হতে যাচ্ছে। নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী। উভয় পক্ষ কীভাবে অংশীদারত্ব সামনে এগিয়ে নিতে পারে, তা নিয়ে এ সফরে আলোচনার সুযোগ রয়েছে।
সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘এই সফরের উদ্দেশ্য হচ্ছে নতুন সরকারের সঙ্গে দেখা করা। সফরটি রাজনৈতিক। তবে আমাদের ধারণা, এখন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ইস্যু একটাই; বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড (এআরটি)’ সই হয়েছে, তার বাস্তবায়ন। ওই চুক্তির মধ্যে জ্বালানি কেনা, বোয়িং কেনা ও কৃষিজ পণ্যের এক্সেসসহ সবকিছুই আছে। এআরটি বাস্তবায়ন নিয়ে এই সফরে আলোচনা হতে পারে। তাদের মূল দৃষ্টি থাকবে যেন এআরটি বহাল থাকে।’
সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের আলোচ্যসূচির অন্যতম বিষয় ছিল পল কাপুরের আসন্ন ঢাকা সফর।
উল্লেখ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত পল কাপুরকে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদের জন্য মনোনীত করেন। মার্কিন সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক কমিটিতে অনুমোদনের পর গত অক্টোবরে তার নিয়োগ চূড়ান্ত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরের পাশাপাশি নতুন সরকার গঠনের পর কোনো বিদেশি প্রতিনিধিরও প্রথম বাংলাদেশ সফর হতে যাচ্ছে এটি
সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। চুক্তি সইয়ের পর সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত পাল্টা শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করেছেন। এর জবাবে তিনি নতুন বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন- প্রথমে ১০ শতাংশ, পরে ১৫ শতাংশ। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১৯ শতাংশ শুল্ক কমে ১০ শতাংশ হচ্ছে।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি আবারও নতুন মোড় নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিটি পর্যালোচনা করতে হবে। কারণ চুক্তির কিছু ধারা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। তারা বলছেন, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়কে বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারে।
সরকারের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই চাইবে আমরা যেন চুক্তিতে থাকি। কারণ তারা বলতে চাইছে, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দিলেও প্রেসিডেন্ট চাইলে নতুন অর্ডার দিতে পারেন।’
সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি করেছে, সে ব্যাপারে এখনো বলার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি। এর পক্ষে-বিপক্ষে কী আছে তা পর্যালোচনা করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।
তারেক রহমানকে ট্রাম্পের চিঠি : বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা িসম্পর্কে জোর
প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় পর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সরকার যাত্রা শুরু করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর প্রথম অভিনন্দন এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ঢাকার মার্কিন দূতাবাস আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই তারেক রহমান ও বিএনপিকে অভিনন্দন জানায়।
পরে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন জানিয়েছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পাঠানো চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন এবং প্রতিরক্ষা চুক্তি করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তারেক রহমানকে লেখা চিঠিতে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমাদের দুই দেশের অংশীদারত্ব পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং একটি মুক্ত ও অবাধ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় (ইন্দো-প্যাসিফিক) অঞ্চল গড়ে তোলার অভিন্ন স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত; যেখানে শক্তিশালী ও সার্বভৌম দেশগুলো সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে। আপনার মেয়াদ শুরুর এই সময়ে আমি আশা করি, আমাদের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাণিজ্যিক সম্পর্কের দারুণ গতি ধরে রাখতে আপনি আমাকে সাহায্য করবেন। এই চুক্তিতে আমাদের উভয় দেশের কৃষক ও শ্রমিকেরা উপকৃত হবেন।’
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি আশা করি, আপনি প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন, যা আপনার সামরিক বাহিনীকে আমেরিকার তৈরি অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ করে দেবে।’
ট্রাম্প আরও লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী করতে আমি আপনার সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় আছি। বাংলাদেশে নিযুক্ত আমার রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। একসঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে আমাদের উভয় জাতিকে আরও সমৃদ্ধ ও নিরাপদ করার সুযোগ রয়েছে।’
এনআই/এমএসএ