৫ জোড়া বিশেষ ট্রেনেই কি মিটবে লাখো মানুষের স্বস্তির ঈদযাত্রা?

আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামবে। নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হওয়ায় লাখো মানুষের প্রথম পছন্দ ট্রেন। তবে, যাত্রীচাহিদা আকাশচুম্বী হলেও সেই তুলনায় সক্ষমতা বাড়াতে পারেনি বাংলাদেশ রেলওয়ে। উল্টো গত কয়েক বছরে ঈদ স্পেশাল বা বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। বর্তমানে এই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র পাঁচ জোড়ায়।
এদিকে, যাত্রীচাহিদা বাড়লেও প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভের (ইঞ্জিন) অভাবে অতিরিক্ত ট্রেন চালানো সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা। ফলে ঈদযাত্রায় বাড়তি ভোগান্তির আশঙ্কা করছেন নিয়মিত ট্রেনযাত্রীরা। প্রতিবার কতটি ট্রেনের ইঞ্জিন ও কোচ ঈদের সময় প্রস্তুত রাখা হবে তা উল্লেখ করলেও, সেটি এবার বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেনি রেলওয়ে। ঈদের সময় গড়ে প্রতিদিন ৫০-৫২ জোড়া ট্রেন চালিয়ে সর্বোচ্চ ৪৮ থেকে ৫০ হাজার মানুষকে রাজধানী ঢাকা থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে নেওয়া সম্ভব হয়।

এ অবস্থায় রেলওয়ে প্রতি ঈদে বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করে। তবে, সেই সংখ্যা বছর বছর কমছে। কোনো কোনো বছর নয় থেকে ১০ জোড়া বিশেষ ট্রেন চালানো হলেও গত বছর (২০২৫) থেকে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র পাঁচ জোড়ায়। এত বিপুলসংখ্যক ঘরমুখো মানুষের চাপ এই নিয়মিত ট্রেনসহ পাঁচ জোড়া বিশেষ ট্রেন বহন করতে পারবে কি না— এ প্রশ্ন এখন যাত্রীদের মুখে মুখে।
রেলওয়ের তথ্য বলছে, ২০২২ সালে ঈদুল ফিতরে ছয় জোড়া বিশেষ ট্রেন চালানো হয়েছিল। এসব ট্রেন তখন চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা, খুলনা-ঢাকা-খুলনা, ভৈরববাজার-কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার ও ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ রুটে চলাচল করে।
২০২৩ সালে বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা ছিল নয় জোড়া। সেবার চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা, ময়মনসিংহ-চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ, চাঁদপুর-সিলেট-চাঁদপুর, ভৈরববাজার-কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার, ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ, জয়দেবপুর-পঞ্চগড়-জয়দেবপুর ও ঢাকা-চিলাহাটি-ঢাকা রুটে ট্রেন চলাচল করে।
২০২৪ সালে চালানো হয় আট জোড়া বিশেষ ট্রেন। এগুলো চাঁদপুর-চট্টগ্রাম-চাঁদপুর, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা, চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম, ভৈরববাজার-কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার, ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ ও জয়দেবপুর-পার্বতীপুর-জয়দেবপুর রুটে চলাচল করে।
২০২৫ সালে সংখ্যা কমিয়ে করা হয় পাঁচ জোড়া। এসব ট্রেন চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা, ভৈরববাজার-কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার, ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ এবং জয়দেবপুর-পার্বতীপুর-জয়দেবপুর রুটে চলাচল করে।

সর্বশেষ চলতি বছর (২০২৬ সাল) ঈদুল ফিতরে পাঁচ জোড়া বিশেষ ট্রেন চালানোর ঘোষণা দিয়েছে রেলওয়ে। রুটও প্রায় ২০২৫ সালের মতো একই রাখা হয়েছে।
ঢাকায় বসবাসকারী চিলাহাটি এলাকার বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, চিলাহাটি ঢাকা থেকে অনেক দূরের পথ। মাত্র দুটি আন্তঃনগর ট্রেন ওই এলাকায় যায়, তাও ১০ থেকে সাড়ে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। মানুষ বাদুড়ঝোলা হলেও ট্রেনে যেতে চায়। কারণ, সড়কপথে ভোগান্তি বেশি।
তিনি বলেন, দুই-তিন বছর আগেও ঈদে অন্তত একটি বিশেষ ট্রেন দেওয়া হতো এই এলাকায়। এখন আর দেওয়া হয় না। ভালো রেলপথ থাকতেও এত বড় রুটে বিশেষ ট্রেন না চালানো রেলওয়ের ব্যর্থতা।
দিনাজপুরের বাসিন্দা মো. শামসুল আলম বলেন, পার্বতীপুর রুটে অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি আন্তঃনগর ট্রেন আছে। এর মধ্যে চারটি ট্রেন দিনাজপুর যায়। তারপরও গার্মেন্টস কর্মীদের জন্য বরাবরই জয়দেবপুর থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত একটি বিশেষ ট্রেন ঈদের সময় চালানো হয়। এটি আমাদের জন্য খুবই ভালো। তারপরও অনেক মানুষ ট্রেন যাওয়ার জায়গা পান না। অনেকে ট্রেনের ছাদে উঠে যায়। আমার মনে হয়, ঈদের আগে ও পরে ১০ দিন বিভিন্ন রুটে আরও বিশেষ ট্রেন চালাতে পারে রেলওয়ে। বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা কমানো ঠিক হয়নি।
এদিকে, রেলওয়ের লোকোমাস্টাররা ঢাকা পোস্টকে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বড় রুটে ট্রেন চালাতে প্রধান বাধা ইঞ্জিনসংকট। দেশে পর্যাপ্ত কোচ থাকলেও লোকোমোটিভের অভাবে অনেক ভালো ও বড় রুটে ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। বিশেষ ট্রেনও চালানো যাচ্ছে না। এজন্য সংখ্যা কমেছে। এতে রেলের আর্থিক ক্ষতিও হচ্ছে।

রেলপথ সম্প্রসারণের সঙ্গে সমন্বয় করে ইঞ্জিন-কোচ বাড়ানো হয়নি : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ
ঈদের সময়ে বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা দিনদিন কমছে— বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারিত হচ্ছে। নতুন নতুন রেলপথ ও রেললাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। এখন অন্তত তিন হাজার কোচ ও ৬০০-এর বেশি ইঞ্জিন দরকার। কিন্তু রেলওয়ে চলছে এর অর্ধেক দিয়ে। এর মধ্যে আবার ৭০ শতাংশ ইঞ্জিন ও ৫০ শতাংশ কোচ মেয়াদোত্তীর্ণ। আমাদের সংকটটা এখানেই।
তিনি বলেন, ঈদের সময় আমাদের আরও বেশি কোচ ও ইঞ্জিন লাগবে— এটা স্বাভাবিক। আমাদের রেলপথ সম্প্রসারিত হলেও কোচ ও ইঞ্জিনের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টি রেলওয়ে মাথায় নেয়নি। জোড়াতালি দিয়ে রেলযোগাযোগ স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। ফলে এখন অসংখ্য জনপ্রিয় ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। আবার অনেক ট্রেন বন্ধের পথে। এমনও মানুষ আছেন যারা বাড়তি বাসভাড়া দিতে পারেন না। তাদের একমাত্র ভরসা সরকারি এই গণপরিবহন (ট্রেন)। কিন্তু লাইনে ট্রেন না চললে তারা যাবেন কীভাবে?
বর্তমানে রেলের নেটওয়ার্ক সচল রাখতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যে কৌশল নিয়েছে, তা অনেকটা ‘জোড়াতালি’ দেওয়ার মতো— উল্লেখ করে এই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, তারা কিছু রুটে ট্রেন বন্ধ রাখছে, কোথাও নতুন করে চালু করছে, আবার কোথাও পুরোনো রুটেই জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালাচ্ছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে রেলের সেবায় বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি।
‘রেলের সেবাকে গতিশীল করতে হলে দ্রুত নতুন ও আধুনিক ইঞ্জিন সংগ্রহ করতে হবে। শুধু নতুন লাইন করলেই হবে না, পর্যাপ্ত ইঞ্জিন ও জনবল নিশ্চিত করে বন্ধ থাকা সব ট্রেন পুনরায় চালু করা উচিত’— মন্তব্য করেন তিনি।
ইঞ্জিন ও কোচ সংকটে রেলওয়ে : মহাপরিচালকের অকপট স্বীকারোক্তি
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন রেলের বর্তমান পরিস্থিতি এবং বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা পোস্টকে তিনি জানান, রেলওয়ের সেবাকে সচল রাখতে বর্তমানে কিছু কৌশলগত পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, আগে যেসব রুটে স্পেশাল ট্রেন চালানো হতো, সেসব রুটে এখন রেগুলার ট্রেন চালানো হচ্ছে। এজন্য বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা কমেছে। এখন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা রুটে রেগুলার ট্রেন চলছে।
‘ঢাকা থেকে খুলনার রুটটি আগে অনেক দীর্ঘ ছিল। ফলে সময়মতো ট্রেন চলত না এবং যাত্রীও কম হতো। কিন্তু বর্তমানে রুটটি ছোট হয়ে আসায় সময় বাঁচছে এবং নিয়মিত ট্রেনের মাধ্যমেই যাত্রীদের সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।’
মহাপরিচালক স্পষ্টভাবে স্বীকার করেন, ‘রেলওয়ের প্রধান সমস্যা হলো ইঞ্জিন এবং কোচের তীব্র সংকট। পর্যাপ্ত সরঞ্জাম না থাকায় ইচ্ছা থাকলেও সব ক্ষেত্রে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।’
এমএইচএন/এসএম