শেষ রক্ষা হলো না কৃষিসচিব এমদাদ উল্লাহর

অবশেষে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘বিতর্কিত’ সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানকে। গত রোববার (২ মার্চ) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জনস্বার্থে তাকে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে পাঠানো হয়েছে।
নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের শীর্ষ পদে রদবদল চলছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বিতর্কিত এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় এবার বাদ পড়লেন কৃষিসচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ান।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের চাকরিকাল ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। সরকার জনস্বার্থে তাকে অবসর প্রদান করা প্রয়োজন বলে মনে করছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’-এর ৪৫ ধারা অনুযায়ী তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এমদাদ উল্লাহর বিরুদ্ধে কাজের চেয়ে নিজের পদ টিকিয়ে রাখতে ‘সিন্ডিকেট’ তৈরি করার বিস্তর অভিযোগ ছিল। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগগুলো হলো— অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বিতর্কিত ও আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রাখা। এছাড়া কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের দামের অস্থিরতা জিইয়ে রাখা, আমদানির খরচ বাড়িয়ে দেওয়া, কর্মকর্তাদের মধ্যে দলাদলি ও বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করা এবং শেষ সময়ে এসে কেবল নিজের চেয়ার বাঁচাতে ‘২৫ বছরের পরিকল্পনা’র নামে লোক দেখানো কাজে লিপ্ত হওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ ছিল।
সিন্ডিকেট গঠন
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর ১৪ আগস্ট তিনি সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি অধস্তন দপ্তর পরিচালনায় চরম অদক্ষতা ও ভুল নীতি গ্রহণ করেন। সিন্ডিকেট ভাঙার প্রতিশ্রুতি দিলেও আদতে তিনি নিজের পছন্দমতো নতুন সিন্ডিকেট তৈরি করেন। এমনকি দক্ষ কর্মকর্তাদের সরিয়ে নিজের ঘনিষ্ঠ ও অদক্ষ কর্মকর্তাদের বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেন।
জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম নামমাত্র দায়িত্বে থাকলেও মূলত সচিবের ইশারায় সব চলত। একাধিক উপদেষ্টার সুপারিশে তখন পার পেয়ে গেলেও নতুন সরকার আসার পর তার শেষ রক্ষা হলো না।
গাড়িবিলাস
অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে প্রাধিকারবহির্ভূত গাড়ি ব্যবহারের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানেননি এমদাদ উল্লাহ। তিনি নিজের জন্য বরাদ্দ করা গাড়ির বাইরে ‘স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচার কম্পিটিটিভনেস’ প্রকল্পের একটি দামি জিপ (ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৫-৩০৩৬) ব্যবহার করতেন। এমনকি বিদায়ের দিনও তিনি সেই গাড়িটি ব্যবহার করেছেন।
সার সংকটে উদাসীনতা
জানা গেছে, সচিব হিসেবে তার যোগদানের মাত্র তিন মাসের মাথায় বোরো মৌসুম শুরু হলে সারাদেশে সারের তীব্র সংকট দেখা দেয়। সেই সময় নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সার কিনতে বাধ্য হন কৃষকরা। অভিযোগ রয়েছে, এই ভয়াবহ সংকট মোকাবিলায় তিনি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। শুধু বোরো মৌসুমই নয়, পরবর্তী আমন এবং চলমান বোরো মৌসুমেও কৃষকদের চড়া দামে সার কিনতে হচ্ছে। সারের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং কৃষকের ভোগান্তি লাঘবে তিনি বরাবরই রহস্যজনকভাবে নিষ্ক্রিয় ছিলেন।
সারের অস্বাভাবিক দাম নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করতেন, ‘নতুন ডিলারশিপ নীতিমালা বাস্তবায়িত হলেই সারের বাজারে এই অস্থিরতা আর থাকবে না।’ তবে অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট অংশীজন বা ডিলারদের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা ছাড়াই তিনি একতরফাভাবে এই নীতিমালা তৈরি করেছিলেন।
অদক্ষতা ও ভুল নীতি
মাঠপর্যায়ের ডিলারদের দাবি ছিল, চলতি মৌসুম শেষ হওয়ার পর যেন এই নীতিমালা কার্যকর করা হয়। কিন্তু তিনি সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে ভরা বোরো মৌসুমের মধ্যেই জোরপূর্বক এটি বাস্তবায়নে নামেন। ফলে ডিলারদের মধ্যে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে সারের খুচরা বাজারে। এমনকি অভিযোগ উঠেছে, একটি বিশেষ সিন্ডিকেটকে নতুন ডিলারশিপ পাইয়ে দিয়ে অনৈতিকভাবে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিতেই তিনি তড়িঘড়ি করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
আওয়ামী তোষণ
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ উইংয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলতে সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ান নিজের পছন্দের কর্মকর্তাদের বেছে নিয়েছিলেন। মজার বিষয় হলো, বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই সচিব অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও কর্মকর্তাদের পদায়নের ক্ষেত্রে ‘আওয়ামী ঘনিষ্ঠতা’কেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েছেন। তার এই বিশেষ সিন্ডিকেটে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয় আহমেদ ফয়সাল ইমামকে (অতিরিক্ত সচিব)। তাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই উইংয়ের প্রধান করা হয়। উল্লেখ্য, তিনি সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলামের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এছাড়া এই বিভাগে যুগ্ম সচিব হিসেবে দায়িত্বে নিয়ে আসা হয় খোরশেদ আলমকে, যিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভৈরবের ইউএনও এবং নাজমুল হাসান পাপনের (বিসিবি’র সাবেক সভাপতি ও সংসদ সদস্য) অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। একইভাবে সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের একান্ত সচিব মনিরুজ্জামনকেও এই বিভাগে নিয়ে আসেন তিনি।
বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও পেঁয়াজ সংকট
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কৃষি সচিবের ভুল তথ্যের খেসারত দিতে হয়েছে সাধারণ ভোক্তাদের। চলতি মৌসুমের শুরুতে বাজারে যখন পেঁয়াজের দাম ৭০-৮০ টাকা ছিল, তখন তিনি আমদানির অনুমতি বন্ধ করে দেন। সচিব দাবি করেছিলেন, দেশে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ মজুত আছে। কিন্তু তার এই ভুল ও একতরফা তথ্যের কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং পেঁয়াজের দাম লাফিয়ে ১২০-১৩০ টাকায় গিয়ে ঠেকে।
তথ্য গোপন ও ফাইলবন্দি নির্দেশনা
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সচিব দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই চাল, গম, ভুট্টা ও আলুসসহ আটটি নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনের সঠিক তথ্য সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তিনি সেই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ বাস্তবায়ন না করে ফাইলবন্দি করে রাখেন। ফলে বাজারের প্রকৃত চাহিদাও সরবরাহের তথ্যে বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যায়।
‘তড়িঘড়ি’ পরিকল্পনা ও পদ রক্ষার চেষ্টা
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে এসে এমদাদ উল্লাহ মিয়ান হঠাৎ করেই ২০৫০ সাল পর্যন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদের কৃষি পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু করেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের মতামত না নিয়ে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে এটি তৈরি করা হয়। এই পরিকল্পনার পুরো দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল পিপিসি উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মাহমুদুর রহমানকে, যিনি সচিবের প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
কর্মকর্তাদের ক্ষোভ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব ঢাকা পোস্টকে বলেন, ২৫ বছরের এই পরিকল্পনা ছিল মূলত নিজের চেয়ার টিকিয়ে রাখার একটি কৌশল। এটি পুরোপুরি একটি ‘লোক দেখানো’ কাজ। তিনি এতদিন ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও কৃষির প্রকৃত উন্নয়নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। অথচ মেয়াদের একদম শেষ সময়ে এসে এ ধরনের বিশাল পরিকল্পনার গল্প ফাঁদা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে ও প্রশাসনে প্রশ্ন তুলেছে।
এএইচআর/এমএআর/