বিজ্ঞাপন

৯০ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে টিকে আছে চট্টগ্রামের ‘চাক সেমাই’

৯০ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে টিকে আছে চট্টগ্রামের ‘চাক সেমাই’

চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজারের কাপাসগোলা রোডের তেলিপট্টির মুখে ছোট্ট একটি পুরোনো সাইনবোর্ড— মেসার্স ফকির কবির বেকারি। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণই মনে হবে, কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এখানে সময় যেন থেমে আছে ঐতিহ্যের কাছে। ব্রিটিশ আমল থেকে ফকির কবিরের বিশুদ্ধ চাক সেমাই চট্টগ্রামের মানুষের কাছে কদর কমেনি।

১৯৩৬ সালে ভাড়া ঘরে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান আজ ৯০ বছরের ঐতিহ্য বয়ে চলছে। এক সময় চাক সেমাই কিনতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসতেন। বিশেষ করে ঈদের আগে লম্বা লাইন ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। এখন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সেমাই বাজারে থাকায় বিক্রিতে কিছুটা ভাটা পড়েছে ঠিকই, কিন্তু মানের প্রশ্নে এ সেমাইয়ের তুলনা নেই। শুধু চট্টগ্রামেই নয়, হাতে হাতে এই সেমাই পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বাইরে, বিশ্বের নানা প্রান্তে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, টাইলস করা পরিচ্ছন্ন পরিবেশে কারিগররা তৈরি করছেন ঐতিহ্যবাহী ‘চাক সেমাই’। উপকরণ মাত্র দুটি— ময়দা আর ফুটন্ত গরম পানি। লবণ, চিনি বা কোনো রং ব্যবহার করা হয় না। কাঠি দিয়ে ময়দা ও পানি মিশিয়ে তৈরি করা হয় খামি। সেই খামি গোল ডাইসে ঢুকিয়ে লম্বা হাতল ঘোরানো হলে নিচ দিয়ে ঝরতে থাকে চিকন সুতোর মতো সেমাই। পরে বাঁশের তৈরি ডালায় বিশেষ কৌশলে চাকের আকারে সাজানো হয় কাঁচা সেমাই।

এরপর রোদে শুকানো— এই ধাপটি নাকি মানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রোদে ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়ার পর দেওয়া হয় বড় চুল্লিতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেমাইয়ের চাক লালচে রং ধারণ করে। উল্টে-পাল্টে নামিয়ে ফেললেই বিক্রির জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।

dhakapost

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক দিলীপ কুমার সিংহ ঢাকা পোস্টকে জানান, রমজানের আগে কিছু সেমাই পাইকারি বিক্রি করা হলেও এখন খুচরা ক্রেতাদের চাহিদা সামলাতেই ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। রমজান ও ঈদ মৌসুমে প্রতিদিন প্রায় ২০০ কেজি সেমাই বিক্রি হয়। প্রতি কেজির দাম ২৫০ টাকা।

তিনি বলেন, শুধু ফুটন্ত পানি আর ময়দা দিয়ে খামি তৈরি করা হয়। সেখান থেকে ডাইসের মাধ্যমে সেমাই তৈরি করা হয়। পরে রোদে শুকিয়ে আগুনে চুল্লিতে দেওয়া হয়। তখন বিক্রির জন্য প্রস্তুত হয় সেমাই। আবার রোদে না শুকালে এই সেমাইয়ের আসল মান আসে না। শুরুতে যে ডাইস ব্যবহার করা হতো, এখনো সেটিই ব্যবহার করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, বাজারে সুযোগ বুঝে অনেকে নিম্নমানের সেমাই সরবরাহ করছে। তবে নিয়মিত ক্রেতারা সরাসরি কারখানায় এসে সেমাই সংগ্রহ করেন। রমজানের চাক সেমাইয়ের চাহিদা অনেক বেশি থাকে। শেষ রমজানগুলোতে সেমাইয়ের জন্য লাইন ধরতে হয়। তখন সেমাই তৈরি করেও সামাল দেওয়া যায় না।

ভোক্তাদের ভাষ্য, কিছু প্রতিষ্ঠান সময়ের সঙ্গে শুধু ব্যবসা নয়, আস্থাও গড়ে তোলে। মেসার্স ফকির কবির বেকারি তেমনই একটি নাম। প্রায় এক শতাব্দী ধরে মান ধরে রেখে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ায় এখনও পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে এই বেকারি। খাদ্যে ভেজালে খবর যেখানে হরহামেশাই শোনা যায়, সেখানে ফকির কবিরের চাক সেমাই নিজস্বতা ধরে রেখেছে।

সেমাই কিনতে আসা বাকলিয়ার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, পাকিস্তান আমলে আমি ছোট ছিলাম। তখন থেকে আমার বাবা ঈদে ফকির কবিরের চাক সেমাই নিয়ে যেতেন। তখন থেকে বাড়ির সবার কাছে জনপ্রিয় এই সেমাই। আমি ১০ কেজি কিনেছি। মেয়ের জন্য কিছু পাঠাবো। বর্তমান বাজারে ভেজালের ভিড়ে এমন সেমাই পাওয়া স্বপ্নের মতো। সেজন্য মানুষের কাছে এখনও এই সেমাই চাহিদা রয়েছে।

জাতিসংঘের (জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপি) কনসালটেন্ট হিবেসে কম্বোডিয়ায় কর্মতর আছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক আবু রুশদ মোহাম্মদ জামিল মাহমুদ। তিনি সম্প্রতি ফকির কবিরের ৫ কেজি চাক সেমাই নিয়ে যান কম্বোডিয়ায়।

ফকির কবিরের চাক সেমাই নিয়ে ঢাকা পোস্টকে তিনি জানান, বহু বছর ধরে দেশের বাইরে থাকলেও তার হৃদয় পড়ে আছে জন্মভূমিতেই। তাই সুযোগ পেলেই পরিচিতজনদের মাধ্যমে দেশ থেকে প্রিয় কিছু জিনিস আনান- সেই তালিকায় নিয়মিত থাকে ফকির কবিরের চাক সেমাই। 

কিছুদিন আগেই পাঁচ কেজি আনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তার মতে, এটি শুধু একটি খাবার নয়, আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। যেমন জাতিসংঘ বিশ্বব্যাপী নানা ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করে, তেমনি আমাদেরও উচিত নিজেদের ঐতিহ্য লালন ও সংরক্ষণ করা।

আরএমএন/জেডএস