তেলের লাইনে দীর্ঘ অপেক্ষা, সংকটের নেপথ্যে কী?

মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতির ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যথেষ্ট জ্বালানি মজুত থাকলেও কৃত্রিম সংকট ও আতঙ্কে রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে চাপ বাড়ছে। তেল কিনতে কোনো কোনো পাম্পের লাইন কয়েক কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মিলছে না চাহিদামাফিক জ্বালানি।
শনিবার (৭ মার্চ) সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা যায়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি কিংবা কৃত্রিম সংকটের গুজবে পাম্পগুলোতে গ্রাহকদের অস্বাভাবিক ভিড় তৈরি হয়েছে। এই আকস্মিক চাপের কারণে অনেক পাম্পের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গতকাল জ্বালানি বিক্রির সর্বোচ্চ সীমা বা রেশনিং পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার।
রাজধানীর মহাখালীর পরিচিত পেট্রোল পাম্প ‘ক্লিন ফুয়েল’। সরকারের ঘোষণার পর আজ সকাল থেকে এই পাম্পে অকটেন ও পেট্রোল নেই। ফলে তেল না পেয়ে অনেক ক্রেতাকে ফিরে যেতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন
পাম্পের কর্মচারী রাসেল বলেন, পাম্পে এখন কোনো তেল নেই। তেলের গাড়ি আগামীকাল আসবে। আশা করছি দুপুর বা বিকেলের দিকে তেল পাওয়া যাবে।
‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলছে বিমানবন্দর এলাকায় অবস্থিত ডি এল ফিলিং স্টেশনেও। অথচ গতকাল এই পাম্পে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। পাম্পের এক কর্মচারী জানান, তাদের দৈনিক ৫ গাড়ি তেলের চাহিদা থাকলেও গতকাল তা ৭ গাড়িতে ঠেকেছিল। অতিরিক্ত চাহিদার কারণে মজুত শেষ হয়ে গেছে। আগামীকাল গাড়ি এলে পুনরায় বিক্রি শুরু হবে।
পরিচিত পাম্পগুলোতে তেল না থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন চালকরা। টঙ্গী থেকে আসা ক্রেতা মুশফিক বলেন, বাসার পাশের পাম্পে তেল নেই। ভেবেছিলাম এয়ারপোর্টের পাম্প থেকে নেব, কিন্তু এখানেও নেই। গাড়িতে তেল খুব কম, এখন অন্য কোথাও গিয়ে পাব কি না তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
ক্লিন ফুয়েলে আসা সিয়াম আহমেদও একই অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, এখানে এসে দেখি তেল নেই। তার আগে একটা পাম্পে গেলাম, সেখানেও পেলাম না। এখন আবার অন্য কোথাও যেতে হবে।
কোথাও রেশনিং, কোথাও মিলছে ফুল ট্যাংক
বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে সরকার ঘোষিত রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। এখানে তেল নিতে আসা যানবাহনের লাইন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে।
পাম্পের ম্যানেজার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামাল হোসেন ঢাকা পোস্টকে জানান, তাদের মজুতে আপাতত সংকট নেই। তবে নিয়ম অনুযায়ী কোনো মোটরসাইকেল ৩০০ টাকার বেশি তেল কিনতে পারছে না। এতে ভোগান্তি হলেও তেল বিক্রি সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে।
সেখানে অপেক্ষমাণ পাঠাও চালক সামির বলেন, ঘণ্টাখানেক দাঁড়িয়ে আছি। ৩০০ টাকার তেলে আমার সারা দিন চলবে না। বাধ্য হয়ে অন্য পাম্পে আবার লাইনে দাঁড়াতে হবে।
অন্যদিকে, তেজগাঁওয়ের আইডিয়াল ফিলিং স্টেশনে রেশনিং ছাড়াই চাহিদামাফিক তেল দেওয়া হচ্ছে। সেখানে বাইকারদের লাইন হাতিরঝিল পর্যন্ত পৌঁছেছে।
পাম্প কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রথমে রেশনিং করার চেষ্টা করলেও ক্রেতাদের চাপের মুখে তারা চাহিদামাফিক তেল দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
ক্রেতা আব্দুর রহিম বলেন, অন্য জায়গায় কোথাও তেল নেই, কোথাও রেশনিং করছে, তাই দেরি হলেও এখান থেকেই ফুল ট্যাংক তেল নেব।
ফুল ট্যাংক তেল নেওয়া ক্রেতা রাইসুল বলেন, এখান থেকে ফুল ট্যাংক তেল নিতে পেরেছি। এর আগে কয়েকটা পাম্প ঘুরে তেল পাইনি।
সার্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির (একাংশ) সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, আতঙ্কিত হয়ে মানুষ অতিরিক্ত তেল কেনায় কিছু পাম্পে সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া আজ শনিবার ছুটির দিন হওয়ায় তেলের গাড়ি চলাচল বন্ধ। তবে দেশে তেলের কোনো ঘাটতি নেই, আগামীকাল থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক আছে। তবে প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে নতুন জাহাজ পৌঁছানো জরুরি। আশা করা যাচ্ছে, আগামী ৯ মার্চের মধ্যে তেলের জাহাজ দেশে আসবে।
উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই, ৯ তারিখ আরও ২টি ভেসেল আসছে
শনিবার (৭ মার্চ) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ৪ নম্বর গেটে সাংবাদিকদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, জ্বালানি তেল নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আগামীকাল থেকে ভ্রাম্যমাণ মোবাইল কোর্ট কাজ শুরু করবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে যে প্যানিক কাজ করছে তার কোনো যুক্তি নেই। তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে সরকার।
ওএফএ/এমএসএ