চাহিদা বাড়ায় জ্বালানি তেলে রেশনিং, মজুত আছে কত দিনের?

বাংলাদেশে দৈনিক জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ১৪ হাজার টন। এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদা ১২ হাজার টন, পেট্রোলের চাহিদা ১২০০ টন এবং অকটেনের চাহিদা ১১০০ টন। তবে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ফলে এ চাহিদা বেড়ে গেছে দ্বিগুণের কাছাকাছি। ফলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ।
এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকার রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রির নির্দেশনা জারি করেছে। এর ফলে ক্রেতারা নির্দিষ্ট সীমার বাইরে অতিরিক্ত তেল কিনতে পারবেন না। পাশাপাশি মজুত ঠিক রাখতে ডিপো থেকে পেট্রোল পাম্পে তেল সরবরাহও কমানো হয়েছে।

দেশে ডিজেলের মজুত কত?
২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ডিজেলের চাহিদা ছিল ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। সেই হিসেবে এর দৈনিক চাহিদা ১২ হাজার টনের মতো। তবে গত ৭ মার্চ পর্যন্ত ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১৭ হাজার ৮৯৯ মেট্রিক টন। গত বছর একই সময়ে ডিজেল বিক্রি হয় ১২ হাজার ২৯ মেট্রিক টন।
বিপিসির তথ্যানুযায়ী, দেশে ডিজেলের মজুত ক্ষমতা ৬ লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ মেট্রিক টন। বর্তমানে (৯ মার্চ) দেশে ডিজেল মজুত আছে ১ লাখ ২০ হাজার ২৩৭ মেট্রিক টন। দৈনিক ৯ হাজার ২২ মেট্রিক টন সরবরাহ করলে এ মজুতে চলবে ১৩ দিন।
বিপিসি বলছে, ১৩ মার্চের মধ্যে ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৫ টন ডিজেল নিয়ে পাঁচটি জাহাজ দেশে ভিড়বে। দৈনিক ৯ হাজার ২২ মেট্রিক টন সরবরাহ অনুযায়ী এ মজুতে চলবে আরও ১৬ দিনের মতো। সর্বমোট ২৯ দিনের ডিজেলের নিশ্চয়তা দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

পেট্রোলের মজুত কত?
দেশে পেট্রোলের মজুত ক্ষমতা রয়েছে ৩৭ হাজার ১৩ টন। দৈনিক এর চাহিদা ১২০০ টনের কাছাকাছি। তবে গত ৭ মার্চ পেট্রোল বিক্রি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৪০০ মেট্রিক টনের কাছাকাছি। অথচ গত বছর একই সময়ে বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৪২৭ মেট্রিক টন। বর্তমান মজুত থেকে দৈনিক ১ হাজার ৭০ মেট্রিক টন সরবরাহ করা হলে ১৭ দিনের মতো চাহিদা পূরণ করা যাবে।
দেশে পেট্রোলের চাহিদার পুরোটাই দেশে উৎপাদন করা হয়। এর মধ্যে ১৬ শতাংশ উৎপাদন করে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরআল)। বাকি ৮৪ শতাংশ বেসরকারি রিফাইনারি থেকে উৎপাদিত হয়।
বিপিসি বলছে, এ মাসে দেশের সরকারি-বেসরকারি শোধনাগার থেকে পেট্রোল ও অকটেন মিলিয়ে ৪০ হাজার টন সরবরাহ আসতে পারে। তাই আপাতত মজুত শেষ হওয়ার আশঙ্কা নেই।
অকটেন মজুত আছে কত দিনের?
দেশে অকটেনের মজুত ক্ষমতা রয়েছে ৫৩ হাজার ৩৬১ মেট্রিক টন। বর্তমানে জ্বালানি তেলটির মজুত রয়েছে ২৩ হাজার ২০৪ মেট্রিক টন। গত বছর এই সময়ে দেশে গড়ে অকটেন বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার ২১৭ টন, সর্বশেষ ৭ মার্চ যা বিক্রি হয়েছে ১১ হাজার ১৬০ মেট্রিক টন। রেশনিং নিয়ম মেনে দৈনিক ৯১৩ মেট্রিক টন সরবরাহ করা হবে ধরলে অকটেনের মজুত রয়েছে ২৫ দিনের।
চাহিদার ৫০ শতাংশ অকটেন বাংলাদেশে উৎপাদন করা হয়। আমদানির বাইরে দেশের চারটি বেসরকারি শোধনাগার থেকে নিয়মিত অকটেন কেনে বিপিসি। দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাসের উপজাত হিসেবে পাওয়া ও আমদানি করা কনডেনসেট শোধন করে অকটেন তৈরি করা হয়। দেশীয় উৎস থেকে এ মাসেই ২৫ হাজার টন অকটেন মজুতে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া আরও ২৫ হাজার টন অকটেন আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে বিপিসির।
অন্যান্য তেলের মজুত
ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন ছাড়া দেশে ফার্নেস অয়েলের মজুত সক্ষমতা রয়েছে ১৪ লাখ ৪ হাজার ৮৬৯ মেট্রিক টন। এখন মজুত রয়েছে ৬২ হাজার ৫৭৯ মেট্রিক টন। দৈনিক ১ হাজার ৩৮৩ টন সরবরাহ করা হবে ধরে নিলে এর মজুত রয়েছে ৪৫ দিনের।
জেট ফুয়েলের মজুত সক্ষমতা রয়েছে ৬৪ হাজার ১১৮ মেট্রিক টনের। বর্তমানে মজুত রয়েছে ৫৪ হাজার ৩৭৫ মেট্রিক টন। দৈনিক ১ হাজার ২৮৪ মেট্রিক টন সরবরাহ করা হবে ধরে নিলে এর মজুত রয়েছে ৪২ দিনের।
জ্বালানি আমদানির চিত্র
বাংলাদেশ মূলত দুই ধরনের জ্বালানি তেল আমদানি করে। এর মধ্যে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানি করা হয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। প্রতি বছর গড়ে ১৫ লাখ মেট্রিক টন আমদানি করা অপরিশোধিত তেল চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। এরপর তা বিপিসির কাছে বিক্রি করা হয়।
অপরদিকে দেশে বছরে পরিশোধিত তেল আমদানি করা হয় ৪৫ লাখ টন। এ তেলের বড় অংশ আসে ভারত ও চীন থেকে। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘায়িত হলে ভারত ও চীনের যেসব রিফাইনারি বাংলাদেশে পরিশোধিত জ্বালানি বিক্রি করে, তারাও সংকটে পড়বে। কারণ তাদের একটি বড় অংশই কম দামে ইরান থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করে পরিশোধন করে।
এ ছাড়া সরকার জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২৮ লাখ ২০ হাজার টন তেল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ২৪ লাখ ২০ হাজার টন উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এবং ১৪ লাখ টন সরকার-টু-সরকার চুক্তিতে আমদানি করা হবে।
ওএফএ/এমএন