প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্যও ফাঁস, সারসংক্ষেপ পাঠাতে নতুন নির্দেশনা

খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্য বেহাত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি সরকারের নানা পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের তথ্যও ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে তথ্যের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো সব ‘সারসংক্ষেপ’ (Summary) আবশ্যিকভাবে বন্ধ খামে মুখ্য সচিব বরাবর পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং ঢাকা পোস্টের হাতে আসা সংশ্লিষ্ট নথি থেকে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত কয়েক দিনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস হয়েছে। বিশেষ করে অনেক নথির বিষয়বস্তু আগেভাগেই জানাজানি হয়ে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা মহলের তদবির শুরু হয়। এই প্রেক্ষাপটে সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতেই এমন কঠোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নীতিনির্ধারণী ও স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁসের অভিযোগে প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এখন থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগ থেকে পাঠানো যাবতীয় ‘সারসংক্ষেপ’ আবশ্যিকভাবে বন্ধ খামে মুখ্য সচিব বরাবর পাঠাতে হবে। ফাইল কভারে খোলা অবস্থায় নথি প্রেরণের ফলে গোপনীয়তা বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে
এদিকে, তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ নির্দেশনা পাঠিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। কার্যালয়ের পরিচালক-১২ মো. মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে— বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগ থেকে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো সারসংক্ষেপ প্রায়শই ফাইল কভারে খোলা অবস্থায় প্রেরণ করা হচ্ছে। এতে নথির গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশ হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সারসংক্ষেপের গোপনীয়তা ও তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এখন থেকে সকল সারসংক্ষেপ আবশ্যিকভাবে বন্ধ খামে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবকে সম্বোধন করে পাঠানোর জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি নির্দেশনা পেয়েছি। সরকার তথ্যের অধিকতর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সময়োপযোগী উদ্যোগ নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে নীতিগত সিদ্ধান্ত, বড় প্রকল্প অনুমোদন ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নসহ নানা বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য নিয়মিত সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়। এসব নথিতে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে। এগুলো আগাম ফাঁস হলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ ও তদবিরের সুযোগ তৈরি হয়।
এ বিষয়ে প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান বলেন, ‘সরকারি নীতিনির্ধারণী নথিপত্রের গোপনীয়তা অত্যন্ত জরুরি। এসব তথ্য আগেভাগে ফাঁস হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় প্রভাব তৈরির আশঙ্কা থাকে। বন্ধ খামে নথি পাঠানোর নির্দেশনা প্রশাসনিক গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। এতে নথি পরিবহনের সময় তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি কিছুটা কমবে।’
‘প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ নথি ব্যবস্থাপনায় কেবল কাগজপত্রের নিরাপত্তা নয়, পুরো প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। যদি নিয়মিতভাবে নথি ফাঁস হওয়ার ঘটনা ঘটে, তাহলে কোথায় দুর্বলতা রয়েছে সেটিও তদন্ত করে দেখা উচিত’— মনে করেন ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান।
নথির বিষয়বস্তু আগাম জানাজানি হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও প্রকল্প অনুমোদন নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত তদবিরের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল খামবন্দি নথিই যথেষ্ট নয়, বরং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায়ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নিয়মিত তথ্য ফাঁস হওয়া প্রশাসনিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়, যা নিরসনে পুরো প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি
জানতে চাইলে সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘কেবল খামে ভরে নথি পাঠানোই তথ্যের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট নয়। নথিপত্রের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায়ও কঠোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ, অনেক সময় ফাইল এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে পাঠানোর সময় কিংবা ডিজিটাল কপির মাধ্যমেও তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটতে পারে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘সরকারি নথি ফাঁস হওয়া মূলত প্রশাসনিক দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো চূড়ান্ত হওয়ার আগেই জানাজানি হয়ে গেলে অনৈতিক তদবির বা প্রভাবশালী মহলের চাপের ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুরো নথি ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।’
এমএম/এমএআর/