চামড়া সিন্ডিকেট ভাঙতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ এখনই নিতে হবে

Dhaka Post Desk

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

০৩ জুলাই ২০২১, ০৬:৪২ পিএম


চামড়া সিন্ডিকেট ভাঙতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ এখনই নিতে হবে

চামড়ার সিন্ডিকেট ভাঙতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ এখন থেকেই নিতে হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) কাদের। 

শনিবার (৩ জুলাই) জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। 

গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, সামনে ঈদুল আযহা বা কোরবানির ঈদ আসছে। বিগত কয়েক বছরের মতো এবারও হয়ত চামড়ার প্রকৃত মূল্য নিয়ে একটা সংকট সৃষ্টি হতে পারে। কাঁচাচামড়া বিদেশে রফতানি করার নিষেধাজ্ঞা আছে। এটি পচনশীল, খুব বেশিদিন সংরক্ষণ করা যায় না।

তিনি বলেন, প্রক্রিয়াজাতকরণ করলেই সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। সেটাতে কারখানার সুবিধা সীমাবদ্ধ। এতে অসৎ উদ্দেশ্যে সিন্ডিকেট করে, তারা যে মূল্য দেবে তাই বিক্রেতা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকে। চামড়া বিক্রির টাকার সুবিধাভোগী ফকির-মিসকিন, এতিম, গরিব, দুস্থ লোকজন বঞ্চিত হন। চামড়ার প্রকৃত বাজারমূল্য নিশ্চিত করতে এ সিন্ডিকেট ভাঙতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ এখন থেকেই গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজন হলে অসাধু ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য কাঁচাচামড়া রফতানি উন্মুক্ত করা যেতে পারে। তখন প্রতিযোগিতার ফলে চামড়ার প্রকৃত মূল্য বিক্রেতারা পাবে।

জিএম কাদের বলেন, সদর হাসপাতাল স্বাস্থ্যসেবা কমিটির সভাপতি পদে সাধারণত পদাধিকার বলে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তারা সঠিকভাবে কাজ করেন না বলে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন হচ্ছে না, এ মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার বক্তৃতায়। কিন্তু এভাবে নিয়োজিত সভাপতির সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব কর্তব্য আছে কি না তা স্পষ্ট নয়। তবে নিজ উদ্যোগে কমিটির মাধ্যমে সংসদ সদস্যরা হাসপাতালের সমস্যা নির্ধারণ ও সমাধানের প্রচেষ্টা নেন।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা কমিটিকে কোনো ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব দেওয়া হয়নি। নিয়ম, আইন বা অর্থ বরাদ্দ এমন কিছুই থাকে না যাতে করে তারা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারেন। প্রায়সময় সিদ্ধান্তকে বাস্তবে রূপ দিতে মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ প্রয়োজন পড়ে। ফলে, তাদের প্রধান কাজ হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা সরাসরি মন্ত্রীকে খুশি করে কাজটি বাস্তবায়ন করা। প্রায় ক্ষেত্রেই সহযোগিতা পাওয়া যায় না। টেলিফোন করলে তারা ধরেন না। পত্র দিলে কোনো উত্তর/সমাধান মেলে না। সংসদ সদস্যরা অনেকেই তখন বাধ্য হয়ে সমাধানের লক্ষ্যে বিষয়গুলো সংসদে তুলে ধরেন। যদিও এরপর সমাধান তেমন একটা পাওয়া যায় না।

এ সময় তিনি নিজের নির্বাচনী এলাকা লালমনিরহাট ও রংপুরের কয়েকটি সমস্যার কথা তুলে ধরেন। বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রায় ২/৩ মাস আগে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সচিবকে মেরামতের অনুরোধ জানিয়েছিলাম। কোনো কাজ হয়নি।  

জাপা চেয়ারম্যান বলেন, লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে একটি অত্যাধুনিক ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন সরবরাহ করা হয়েছিল। তোপখানা রোডের মেসার্স বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল সেটি সরবরাহ করে। কিন্তু মাত্র ২০ দিন কাজ করার পর মেশিনটি বন্ধ হয়ে যায়। এ কোম্পানির সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করা সত্ত্বেও তারা কোনো সার্ভিস প্রদান করেনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং মন্ত্রণালয়ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটিকে চিঠি দিয়েছে। এই পর্যন্তই রয়েছে। কিন্ত মেশিনটি চলছে না। আমার দাবি ছিল মেশিনটি চালানোর ব্যবস্থা করার। আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে মেশিনটি চালু করার বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।   

তিনি বলেন, বর্তমানে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে সাধারণ রোগীর পাশাপাশি করোনা রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। সব ধরনের রোগীর জরুরি চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিছু যন্ত্রপাতি ও ওষুধের চাহিদা দিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে চাহিদা পত্র দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী একেবারে ইউনিয়ন পর্যায়ে ক্লিনিক করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা মনে করি এগুলোকে এখন কাজে লাগানো দরকার। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যন্ত আছে সেগুলোতে যেখানে মঞ্জুরিকৃত পদ খালি আছে। সেখানে ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও অন্যান্য কর্মচারী জরুরিভাবে নিয়োগ দিতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। চিকিৎসা সহায়ক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের প্রয়োজন নিরুপণ ও সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। এগুলো যে ব্যবহার উপযোগী থাকে ও রোগীদের সেবায় ব্যবহৃত হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, প্রতিটি চিকিৎসা কেন্দ্রে করোনা চিকিৎসার জন্য আলাদা চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকতে হবে। জেলা পরে উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে অক্সিজেন ও ভেন্টিলেটর সুবিধাসহ আইসিইউ চালুর ব্যবস্থা করতে হবে। কমপক্ষে জেলা পর্যায় পর্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে করোনাভাইরাস শনাক্ত করার ব্যবস্থা সম্প্রসারিত করতে হবে।

কাদের বলেন, এক বছর আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যে হাল ছিল, এখনো সেই হালই আছে, কোনো উন্নতি হয়নি। যদি উন্নতি হত তাহলে আজকে এত মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ত না। দিনকে দিন কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুহার বৃদ্ধির সংখ্যা আমরা স্বাস্থ্য অধিদফতরের মাধ্যমে জানতে পারছি। এটা বৃদ্ধি পেয়ে কোন স্তর পর্যন্ত পৌঁছাবে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ভারতের মতো ছড়ালে ও মৃত্যুর হার একই কারণে হলে বাংলাদেশ মহামারিতে তছনছ হয়ে যেতে পারে। 
 
তিনি বলেন, আইন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত আলোচনার সময় মোবাইল কোর্ট গঠন সম্পর্কে একজন সংসদ সদস্য কিছু আপত্তি উত্থাপন করেছিলেন। সে সম্পর্কে আইনমন্ত্রী মোবাইল কোর্ট গঠন সঠিক ছিল মর্মে যুক্তি দিয়েছিলেন। মোবাইল কোর্টের নামে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এখনো বিচারিক ক্ষমতা রয়ে গেছে। ক্ষমতাটি আইন এবং সংবিধান বহির্ভূতভাবে তাদেরকে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের ব্যক্তিদের ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, অপচর্চা ও স্বেচ্ছাচারিতা চলছে বলে প্রায়ই অভিযোগ পাওয়া যায়।

বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, আইনমন্ত্রী বলেছেন আমাদের দেশে এর প্রয়োজন, অন্যান্য দেশে আছে। এর ফলে সংবিধান ও উচ্চ আদালতের রায়ের দিক নির্দেশনা লঙ্ঘিত হচ্ছে, এ কথাটির উল্লেখ করেননি। তবে সে কারণেই বাধা প্রদান করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক পদে নিয়োগ লাভের জন্য আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত যোগ্যতা না থাকলে তিনি বিচারকপদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না। এ আইন তৈরির যথেষ্ট তাগিদ থাকার পরও সরকার উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত আইনটি করে সংবিধানের উদ্দেশ্যকে সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করছেন না।

জিএম কাদের বলেন, করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির এই সময়ে জীবনযাত্রার স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা বিজ্ঞানের এই যুক্তি কী শুধুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ক্ষেত্রেই কার্যকর নাকি অন্যান্য সব বিষয়ের ক্ষেত্রেই পালন যোগ্য। অন্যান্য দেশগুলোতে কি শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থেকেছে? আমাদের দেশে শুরু হওয়া ১ জুলাইয়ের লকডাউনের পূর্বে অফিস, ব্যাংক, শিল্পকারখানা, বাজার, শপিংমল, দোকান, গণপরিবহন ও যোগাযোগের এমন কোনো মাধ্যম নেই যা বন্ধ ছিল। সেখানে কি এরকম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আর এগুলো খোলা ছিল?

তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যান্য সব স্থানে অহরহ যাতায়াত করছে তারা। অভিভাবকরা জীবিকার প্রয়োজনে অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণের জন্য বাজার ও অন্যান্য স্থানে যাতায়াত করছেন তাদের পরিবার পরিজন। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না গেলেই শিক্ষার্থীরা সংক্রমিত হবে না, এর পক্ষে কী কোনো যুক্তি আছে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, দেশে মাদকের বিস্তার কোনোভাবেই কমছে না। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই এখন হাতের নাগালে মাদক। আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন পরিবারগুলো। আর মাদকে অভ্যস্ত হচ্ছে ছিন্নমূল শিশু থেকে শুরু করে সমাজের উচ্চবিত্তরাও। অভিভাবকরা ভীত হয়ে পড়েছেন কোমলমতি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মাদক গ্রহণের অভ্যস্থতা নিয়ে। করোনা মহামারিতে বিস্তার আরো বেড়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর আরো অধিক কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এছাড়াও মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বিশেষায়িত বিভাগ খোলার দাবি জানান তিনি।   

জাপা চেয়ারম্যান বলেন, পৃথিবীর বায়ু দূষণের তালিকায় ঢাকার অবস্থান অন্যতম প্রধান শহরগুলোর মধ্যে একটি। এর প্রধান কারণ যানজট। আর ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ। নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায়, জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পগুলো এখন সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করার উদ্দেশ্য, প্রকল্পের সময় বৃদ্ধির নামে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি করে দুর্নীতির মাধ্যমে অধিক অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।

তিনি বলেন, একটু ভালোভাবে বাঁচার আশায় মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে ইউরোপের উদ্দেশ্যে ভুমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছে দেশের বেকার যুবক ছেলেরা। গত কয়েকদিন আগে তিউনিসিয়া ও লিবিয়া জলসীমা থেকে উদ্ধার হয়েছে বাংলাদেশের ৩৭৮ জন। উদ্ধার হওয়াদের বক্তব্য হচ্ছে জীবিকার উদ্দেশ্যে এমন ঝুঁকি তারা নিয়েছে। এ বিষয়ে জাতি হিসাবে আমাদের কী কিছুই করার নেই। এ দেশ থেকে ১২শ’র মতো নারীকে ভারতে পাচার করে অসামাজিক কাজে লিপ্ত করা হয়েছে। বন্দিদশা থেকে ফিরে আসাদের বক্তব্য এই সংখ্যা নাকি আরো কয়েকগুণ বেশি। শোনা যায় এরাও নাকি ভালো বেতনের কাজ পাওয়ার আশায় ভারতে গিয়েছিল।

জিএম কাদের বলেন, এসব ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের এখনো চিহ্নিত করা হয়নি এবং এদের মুখোশ উন্মোচন এখনও অনুৎঘাটিত আছে। কেবলমাত্র যারা এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাহক শুধু তাদের কয়েকজনকেই ধরা হয়েছে। জড়িত ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির দাবি করছি।

এইউএ/জেডএস

Link copied