ত্যাগের মহিমায় উৎসবের আমেজ, পবিত্র ঈদুল ফিতর আজ

এক মাসের সিয়াম সাধনা ও ইবাদত-বন্দেগির পর আজ শনিবার (২১ মার্চ) দেশজুড়ে উদযাপিত হবে মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর। যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আনন্দ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ঈদের নামাজ আদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন রাজধানীসহ সারা দেশের লাখ লাখ মুসল্লি। বৈরী আবহাওয়ার শঙ্কা থাকলেও জাতীয় ঈদগাহসহ দেশের প্রতিটি বড় ময়দান ও মসজিদে সম্পন্ন হয়েছে জামাতের সকল আয়োজন।
বিজ্ঞাপন
এবার পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল সাড়ে ৮টায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। তবে আবহাওয়ার বৈরিতা বা অনিবার্য কোনো কারণে এই জামাত সম্ভব না হলে, সকাল ৯টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে প্রধান জামাতটি অনুষ্ঠিত হবে।
ঈদের প্রধান জামাতে ইমামতির দায়িত্ব পালন করবেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক। তার অনুপস্থিতিতে বিকল্প ইমাম হিসেবে প্রস্তুত থাকবেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুফাসসির ড. মাওলানা মো. আবু ছালেহ পাটোয়ারী।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে দেশবাসীর সঙ্গে ঈদ জামাতে শরিক হবেন।
বৈরী আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠানের যাবতীয় প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম ঢাকাবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রধান জামাতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি জানান, এবারের জামাতে ৩৫ হাজার মুসল্লির নামাজের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩ হাজার ৫০০ নারী মুসল্লিও অংশ নিতে পারবেন। নারীদের জন্য আলাদা প্রবেশপথ, ওজু ও নামাজের সংরক্ষিত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ মুসল্লিদের জন্য পর্যাপ্ত ওজুখানা ও জরুরি প্রয়োজনে মেডিকেল টিমের সুবিধাও রাখা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
নিরাপত্তার বিষয়ে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার জানিয়েছেন, ঈদ জামাতকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা শঙ্কা নেই। তবুও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। পুরো ঈদগাহ ময়দান ও আশপাশের এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মৎস্য ভবন, প্রেসক্লাব এবং শিক্ষা ভবন মোড়ে ব্যারিকেড দেওয়া থাকবে, যাতে কোনো যানবাহন ঈদগাহ এলাকায় প্রবেশ করতে না পারে। প্রবেশমুখে আর্চওয়ে ও মেটাল ডিটেক্টর ব্যবহারের পাশাপাশি সিটিটিসির ডগ স্কোয়াড এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চের সুইপিং টিম মোতায়েন থাকবে। প্রধান জামাতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিচারপতিগণ, মন্ত্রিসভার সদস্য ও মুসলিম বিশ্বের কূটনীতিকরা অংশগ্রহণ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) উদ্যোগে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে (চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র সংলগ্ন) সকাল ৮টায় কেন্দ্রীয় ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান নগরবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এই জামাতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রশাসক জানান, মুসল্লিদের জন্য একটি সুশৃঙ্খল ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ঈদগাহে প্রবেশের জন্য তিনটি গেট রাখা হয়েছে এবং নারীদের জন্য আলাদা প্রবেশপথ ও নামাজের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও মুসল্লিদের সুবিধার্থে ওজুর সুব্যবস্থাও থাকছে।
আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুরো এলাকায় বিশেষ নজরদারি থাকবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ডিএনসিসি-র এই কেন্দ্রীয় ঈদ জামাতকে ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ডিএমপির পক্ষ থেকে দুই প্লাটুন পুলিশ মোতায়েন করা হবে।
বায়তুল মোকাররমে পাঁচটি জামাত
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদের ৫টি জামাত অনুষ্ঠিত হবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে পর্যায়ক্রমে পাঁচটি ঈদ জামাত সকাল ৭টা, ৮টা, ৯টা, ১০টা ও বেলা পৌনে ১১টায় অনুষ্ঠিত হবে।
প্রথম জামাতে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম মাওলানা মিজানুর রহমান, দ্বিতীয় জামাতে পেশ ইমাম মুফতি মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী, তৃতীয় জামাতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক মাওলানা মো. জাকির হোসেন, চতুর্থ জামাতে ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমির ধর্মীয় প্রশিক্ষক মাওলানা যোবায়ের আহমেদ আল আযহারী এবং পঞ্চম ও সর্বশেষ জামাতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুফতি মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ইমামতির দায়িত্ব পালন করবেন। এ সময় বিকল্প ইমাম হিসেবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সহকারী লাইব্রেরিয়ান মাওলানা শহীদুল ইসলাম প্রস্তুত থাকবেন।
জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ঈদের জামাত
জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় পবিত্র ঈদুল ফিতরের জামাত সকাল ৮টায় অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় সংসদের স্পিকার, চিফ হুইপ, হুইপবৃন্দ, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য ও সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ মুসল্লিরা এই জামাতে অংশ নেবেন। জামাত সবার জন্য উন্মুক্ত। আগ্রহী মুসল্লিদের অংশগ্রহণের জন্য সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে ঈদের জামাত
এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ মসজিদুল জামি’আয় পবিত্র ঈদুল ফিতরের দুটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম জামাত সকাল ৮টায় এবং দ্বিতীয় জামাত সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, প্রথম জামাতে ইমামতি করবেন মসজিদের সিনিয়র ইমাম খতিব হাফেজ মাওলানা নাজীর মাহমুদ এবং দ্বিতীয় জামাতে ইমামতি করবেন সিনিয়র মোয়াজ্জিন এম এ জলিল।
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে মঙ্গলবার থেকে টানা ৭ দিনের সরকারি ছুটি শুরু হয়েছে। সরকারি, আধা-সরকারি ভবন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি ভবন ও সশস্ত্র বাহিনীর সকল স্থাপনাসমূহে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এছাড়া ‘ঈদ মোবারক’ খচিত ব্যানার মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক আইল্যান্ড ও লাইট পোস্টে প্রদর্শন করা হচ্ছে। ঈদুল ফিতরের আগের রাতে সরকারি ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহে আলোকসজ্জা করা হয়।
সারাদেশে বিভাগ, জেলা, উপজেলা, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ এবং বেসরকারি সংস্থাসমূহের প্রধানরা জাতীয় কর্মসূচির আলোকে নিজ নিজ কর্মসূচি প্রণয়ন করে ঈদুল ফিতর উদযাপন করবেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি গণমাধ্যমসমূহ বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার এবং সংবাদপত্রসমূহ বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করবে।
ঈদ উদযাপন উপলক্ষ্যে দেশের সব হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশু সদন, বৃদ্ধ নিবাস, ছোটমনি নিবাস, সামাজিক প্রতিবন্ধী কেন্দ্র, আশ্রয় কেন্দ্র, সেফ হোম, ভবঘুরে কল্যাণ কেন্দ্র, দুস্থ কল্যাণ ও মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে উন্নত মানের খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনসমূহ যথাযথভাবে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করবে। সারাদেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
ঈদের দিন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন সকল শিশু পার্কে বিনা টিকিটে প্রবেশ ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা বিনা টিকিটে জাদুঘর, আহসান মঞ্জিল ও লালবাগের কেল্লাসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে প্রবেশ করতে পারবে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে শিশুদের জন্য ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছে।
এএসএস/এমএসএ