‘যাকে টর্চার করে হত্যা করতে চেয়েছে, আজকে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী’

রাজধানীর পল্টন থানার মানবপাচার আইনের মামলায় এক-এগারোর সময়ে আলোচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) রিমান্ড শুনানিতে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, সে যাকে টর্চার করে হত্যা করতে চেয়েছে, আজকে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী।
এদিন বিকেলে তাকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপ-পরিদর্শক রায়হানুর রহমান মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তার ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ড আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন।
শুনানিতে ফারুকী বলেন, এই লোকটাকে আমরা ওয়ান ইলেভেনে দেখেছি। তিনি ট্রুথ কমিশন করেছিলেন। ট্রুথ কমিশন করে তারা বলেছিলেন, যারা যারা দোষ স্বীকার করে টাকা দিবে তাদের মাফ করে দেয়া হবে। এইভাবে তারা হাজার হাজার কোটি টাকা তার নেতৃত্বে আদায় করে।
বিজ্ঞাপন
সেনাসমর্থিত সেই সরকারের সময়ে একটা টাস্কফোর্স করা হয়। সে ছিল টাস্ক ফোর্সের প্রধান। টাস্ক ফোর্স বলতে মানুষকে ধরে এনে নির্যাতন করা, তাদের থেকে টাকা আদায় করা, এভাবে যে কাজটা করেছে তারা, তার প্রধান ছিল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। এভাবে ট্রুথ কমিশনের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আদায় করে সে মেরে দিয়েছিল এবং বিদেশে পাচার করেছিল।
তিনি আরও বলেন, ওয়ান-ইলেভেন বাংলাদেশে এমন কোনো ব্যবসায়ী নেই, যে ব্যবসায়ীকে তারা ধরে নিয়ে আসেনি এবং তার কাজ থেকে টাকা আদায় করেনি। এর পেছনে যে মূল হোতা ছিল সে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
ফারুকী বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের হয়রানি করা, টর্চার করা এবং তাদেরকে পঙ্গু করে দেওয়া এবং মাইনাস টু যে ফর্মূলা নিয়ে এসেছিল। বিশেষ করে পরবর্তীতে একটা পক্ষের সঙ্গে আপস করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তার পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়া এবং তাদেরকে মেরে ফেলার যে প্লান ছিল, সেই প্লানের নীল নকশার প্রধান ছিল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। কিন্তু দেশের মানুষ এ ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ করার ফলে একসময় তারা ফ্যাসিস্ট হাসিনার সঙ্গে হাত মিলিয়ে একটি তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতায় বসায়। এর পুরস্কারস্বরূপ তাকে অষ্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূত করে। পরবর্তীতে সে বাংলাদেশে আসে। চব্বিশের আমি-ডামির নির্বাচনে গৃহপালিত বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রার্থী হলে ভোট চুরি করে তাকে ফেনী-৩ আসনে এমপি নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, সে প্রথম থেকেই অসৎ এবং সেই অসৎ চিন্তাভাবনা থেকেই সে কাজ চালিয়ে গেছে। টোটাল পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু সত্য একদিন না একদিন প্রকাশিত হয় সে যাকে টর্চার করে হত্যা করতে চেয়েছে আজকে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, সে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সিন্ডিকেটের হোতা। ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমেদের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়েন। ব্যবসার নামে তাদের এই অপকর্মের কারণেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। একজন আসামির স্বীকারোক্তিতে তার নাম এসেছে। এ চক্রের হোতাদের বের করাসহ মামলার তদন্তের স্বার্থে আসামির ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা আবশ্যক।
আসামিপক্ষের আইনজীবী মোর্শেদ আলম শাহীন রিমান্ড বাতিলসহ জামিন চান। তিনি বলেন, এই মামলা একবার চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) হয়েছে। এরপর পুনঃতদন্ত হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সাজানো। তার বয়স ৮০ বছর। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। আমরা রিমান্ড বাতিলসহ জামিন চাচ্ছি।
শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ রিমান্ডের এ আদেশ দেন।
এদিকে শুনানি শেষে আদালতের এজলাস থেকে তাকে পুলিশ প্রহরায় হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় তার গায়ে ময়লা পানি ও পঁচা ডিম নিক্ষেপ করা হয়। মাসুদ উদ্দিনকে লক্ষ্য করে ছোড়া ময়লা পানি দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের গায়েও লাগে।
এর আগে সোমবার রাতে রাজধানীর বারিধারা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর পল্টন থানার মানবপাচার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
সিন্ডিকেট করে অর্থ আত্মসাৎ ও মানবপাচারের অভিযোগে গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর পল্টন থানায় মামলাটি দায়ের করেন আফিয়া ওভারসিজের প্রোপাইটর আলতাব খান। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলায় সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমেদ, সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন, সাবেক সংসদ সদস্য ও এম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী (অব.), আহমেদ ইন্টারন্যাশনালের প্রোপাইটর ও সাবেক এমপি বেনজীর আহমেদ এবং ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের প্রোপাইটর মো. রুহুল আমীন স্বপনসহ ১০৩ জনকে আসামি করা হয়।
বাদী আলতাব খান অভিযোগ করেন, জনশক্তি রপ্তানিতে দুই হাজারের বেশি রিক্রুটিং এজেন্ট থাকলেও আসামিরা মাফিয়া সিন্ডিকেট চক্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করে সংবিধানের মূলনীতি পরিপন্থি জঘন্য অপরাধ করেছে। মালার আসামি সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন, সরকারি চাকুরিরত অবস্থায় নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছেলেকে সিন্ডিকেট চক্রের সদস্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আর সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমেদ তার পরিবারের সদস্য অর্থাৎ তাহার স্ত্রীর বড় ভাইয়ের ছেলেকে বিধিবর্হিভূতভাবে একটি প্রবাসী নামক অ্যাপস চালু করার অনুমোদন দিয়ে চক্রকে সহযোগিতা করেছে।
বাদী আরও উল্লেখ করেন, পরস্পর যোগসাজশে তার সরলতার সুযোগে ভয়ভীতি ও বলপ্রয়োগ করে মানবপাচারের উদ্দেশ্যে তার কাছ থেকে জোর করে অতিরিক্ত চাঁদা হিসেবে প্রত্যেকের দেড় লাখ টাকা হারে ৮৪১ জনের ১২ কোটি ৫৬ লাখ এক হাজার টাকা আদায় করেছে। এছাড়া তারা সংঘবদ্ধভাবে অন্যান্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে আত্মসাৎ করেছে।
এনআর/এসএইচএ