বিজ্ঞাপন

দুই সেনা কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ

এক-এগারোর নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য, তালিকায় প্রভাবশালী নাম

অ+
অ-
এক-এগারোর নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য, তালিকায় প্রভাবশালী নাম

দুই অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদে এক-এগারোর পটভূমি ও সেসময় অনেকের ভূমিকা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে বলে দাবি করেছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তৎকালীন উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কয়েকজন ব্যক্তির তালিকা করে তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে পুলিশসহ গোয়েন্দা ইউনিটগুলো।

বিজ্ঞাপন

রোববার (২৯ মার্চ) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিবির কর্মকর্তাদের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ডিবির অভিযানে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গত ২৩ মার্চ রাতে বারিধারা ডিওএইচএস এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন পল্টন থানার একটি মানব পাচার মামলায় তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় ডিবি পুলিশ। অন্যদিকে, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল শেখ মামুন খালেদকে ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে মিরপুর ডিওএইচএস এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বৃহস্পতিবার তাকে মিরপুরে ফল ব্যবসায়ী দেলোয়ার হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় ডিবি পুলিশ।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এক-এগারোতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ, মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন এবং চাকরিচ্যুত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারীসহ সাবেক কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা এবং বেসামরিক কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম রয়েছে। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ২০০৭ সালে এক-এগারোর সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসি ছিলেন। শেখ মামুন খালেদ প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক। এক-এগারোর সময় তিনি ছিলেন প্রভাবশালী।

বিজ্ঞাপন

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা যায়, তাকে জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এসেছে, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সরিয়ে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়াটি ছিল সমন্বিত একটি উদ্যোগ। ইয়াজউদ্দিনকে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়াতে চাপ দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার দিন ইয়াজউদ্দিনের বাসভবনে একটি চা-চক্রে তাকে সরিয়ে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিষয়ে সামরিক বাহিনীর শীর্ষপর্যায়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।

আরও জানা যায়, ওই বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিদের অনেককেই নজরদারিতে রাখা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী দাবি করেছেন, ২০০৭ সালের ১২ জানুয়ারি ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের আগে বিষয়টি দুই প্রধান রাজনৈতিক নেত্রীকে জানানো হয়েছিল। সে সময় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, গ্রহণে তখনকার সেনা কমকতাদের প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের খসড়া তাদের পক্ষ থেকে নির্ধারিত হতো।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে আরও জানা যায়, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে তৎকালীন সেনা কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নিতেন। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারের আগে বিষয়টি দুটি প্রভাবশালী রাষ্ট্রকে জানানো হয়েছিল তাদের সংসদ ভবন এলাকায় বিশেষ কারাগারে রাখার সিদ্ধান্তও সে সময় সেনা কর্মকর্তাদের পরামর্শে নেওয়া হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

সূত্র জানায়, এই দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে, দুই নেত্রী (খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা) কারাগারে থাকার সময় নির্বাচন ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে পর্দার আড়ালে দর-কষাকষির প্রক্রিয়ায় তৎকালীন ডিজিএফআই কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নিয়মিত কারাগারে গিয়ে বৈঠকও করতেন।

তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, মাসুদ উদ্দিন অনেক প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছেন এবং নিজের বিষয়ে সতর্ক থাকছেন। ফলে তার দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্টতদের কাছ থেকে আরও জানা যায়, ওয়ান-ইলেভেনের সময়কালে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ ন্যাশনাল মনিটরিং সেন্টারের (এনএমসি) নীতিনির্ধারক ছিলেন। ২০০৮ সালে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) আওতাধীন গড়ে ওঠা মোবাইল ফোনে আড়িপাতার মাষ্টারমাইন্ড বলা হয় তাকে। এনএমসি পরবর্তী সময়ে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারে (এনসিএমসি) রূপান্তর হলে তারও দায়িত্বে ছিলেন ডিজিএফআইর সাবেক এই মহাপরিচাল। ক্ষমতার অপব্যবহার ও তৎকালীন সরকার প্রধানের একনিষ্ঠ সৈনিক হিসেবেও কাজ করেন শেখ মামুন। তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নেতাদের   গুমের সঙ্গেও সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সূত্রে তার সম্পর্কে আরও জানা যায়, গত ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে সিগন্যালস কোরের কর্মকর্তা হিসেবে শেখ মামুন ডিজিএফআইতে পরিচালক (এফএসআইবি) হিসেবে যোগ দেন। পরে ২০০৮ সালের জুনে তিনি ব্রিগেডিয়ার চৌধুরী ফজলুল বারির স্থলাভিষিক্ত হয়ে পরিচালকের (কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর-সিআইবি) দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোল্লা ফজলে আকবরের উত্তরসূরি হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১১ সালে মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে ডিজিএফআইতে ফিরে আসেন।

আরও জানা গেছে, শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছিল। এর মধ্যে ডিজিএফআইকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার অভিযোগ, এক-এগারোর সময় তার বিতর্কিত ভূমিকা এবং জলসিঁড়ি আবাসন-সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়গুলো রয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গ্রেপ্তার  করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

তাদের দুই জনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। এই দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে ডিবিতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে তদন্ত কার্যক্রম চলছে আমাদের।

এমএসি/এসএম