বিজ্ঞাপন

প্যানিক বায়িং নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল অ্যাপ চালু হচ্ছে: ডা. জাহেদ উর রহমান

অ+
অ-
প্যানিক বায়িং নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল অ্যাপ চালু হচ্ছে: ডা. জাহেদ উর রহমান

জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি দূর করা এবং ‘প্যানিক বায়িং’ (আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনা) নিয়ন্ত্রণে সরকার দ্রুতই একটি ডিজিটাল অ্যাপ চালু করতে যাচ্ছে। এই অ্যাপের মাধ্যমে জ্বালানি ক্রয়ের সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য জানান।

প্যানিক বায়িং নিয়ন্ত্রণে সরকার কী করছে— জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতি বজায় রাখতে এবং ‘প্যানিক বায়িং’ নিয়ন্ত্রণে সরকার একটি বিশেষ ডিজিটাল অ্যাপ চালুর পরিকল্পনা করেছে। এই অ্যাপের মাধ্যমে জ্বালানি ক্রয়ের একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। ফলে কে কতটুকু জ্বালানি সংগ্রহ করছেন তা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ থাকবে না।

উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ ‘হরমুজ প্রণালী’তে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক সরবরাহে বড় প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এটি একটি বড় ঝুঁকি। তাই সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে ডলার ব্যবহারের বিষয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান স্পষ্ট করেন যে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি ক্রয়ের ব্যয় সব সময়ই বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। দেশের বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ানো হলে কেবল অভ্যন্তরীণভাবে সরকারের ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমে, কিন্তু জাতীয় রিজার্ভের ওপর থেকে চাপ কমে না। তাই ভর্তুকি ও রিজার্ভকে দুটি ভিন্ন বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার ওপর তিনি জোর দেন।

দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত ভর্তুকি জাতীয় অর্থনীতির সক্ষমতা কমিয়ে দেয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভর্তুকি হঠাৎ কমিয়ে দিলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা থাকে, যা সাধারণ মানুষের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ কারণে জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি একটি অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত।’

জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত (যেমন: দোকানপাট ও অফিস সময় পরিবর্তন) নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে তিনি জানান, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং প্রয়োজনে আরও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। এছাড়া, সড়ক নিরাপত্তায় শৃঙ্খলা ফেরাতে অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশাগুলোকে দ্রুত নিয়মের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

বর্তমান সরকারের দুর্নীতিও খতিয়ে দেখবে পুনর্গঠিত দুদক: তথ্য উপদেষ্টা

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পুনর্গঠিত হওয়ার পরপরই এসব অভিযোগের তদন্ত শুরু হবে।

স্থানীয় সরকার ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ বেশকিছু দপ্তরের দুর্নীতির তদন্ত হবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের দুদক এখনো পুনর্গঠিত হয়নি। এটি সম্পন্ন হওয়ার পর কমিশনের মাধ্যমেই আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে।’ তিনি যোগ করেন, ‘দুদকের মতো প্রতিষ্ঠান তৈরির উদ্দেশ্য কেবল অতীতের হিসাব নেওয়া নয়, বরং বর্তমান সরকারের ভেতরেও কোনো অনিয়ম হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা। এই সরকার দুর্নীতির লাগাম টানতে বদ্ধপরিকর, তাই আমাদের সময়েও কোনো দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তার খোঁজখবর অবশ্যই নেওয়া হবে।’

সরকারের সমালোচনা করার দায়ে এক নারীকে গ্রেপ্তারের ঘটনা নিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সরকার মানুষের বাকস্বাধীনতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে, বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে বা অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।’

উপদেষ্টা স্পষ্ট করে বলেন যে, শুধুমাত্র মতপ্রকাশের কারণে কাউকে হয়রানি করা উচিত নয় এবং এ ধরনের ঘটনাগুলো সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে।

যোগাযোগের ঘাটতি স্বীকার ও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার ঘোষণা

সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও তথ্যের সঠিক প্রবাহ নিয়ে জনগণের মধ্যে থাকা অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সরকারি যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিদ্যমান ঘাটতির কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, জনগণের কাছে সঠিক তথ্য সময়মতো পৌঁছে দিতে এবং সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে এখন থেকে নিয়মিত ব্রিফিংয়ের বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

দেশের দীর্ঘদিনের ঋণখেলাপি সমস্যা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, এটি কেবল খেলাপি হওয়ার বিষয় নয়, বরং আইনের দুর্বল প্রয়োগই এখানে প্রধান অন্তরায়। বিদ্যমান আইনগুলো এমনভাবে প্রয়োগ করা হয়, যেখানে চাইলেই বিভিন্ন উপায়ে ঋণ লুকিয়ে ফেলার সুযোগ থাকে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অনেক ক্ষেত্রে সামান্য ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল (রেশিডিউল) করা বা মামলার আড়ালে প্রকৃত খেলাপির তথ্য গোপন করার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। সরকার এই পুরো প্রক্রিয়াটি খতিয়ে দেখছে।

বিশেষ করে যারা শুরু থেকেই ঋণ ফেরত না দেওয়ার উদ্দেশ্যে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন, অর্থাৎ ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ (উইলফুল ডিফল্টার), তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ওপর জোর দিয়েছেন উপদেষ্টা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘যারা সুপরিকল্পিতভাবে জনগণের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন, তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সুরক্ষায় সরকারের অগ্রাধিকার

সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং দেশের অস্তিত্ব রক্ষায় শক্তিশালী অর্থনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, ‘একটি সরকারকে টিকে থাকতে হলে এবং দেশের সার্বিক উন্নতি নিশ্চিত করতে হলে অর্থনীতির চাকা সচল করা অপরিহার্য। ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় আয় বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।’

উপদেষ্টা স্পষ্ট করেন যে, সরকার জনগণের ওপর উচ্চ করের বোঝা চাপিয়ে দিতে চায় না। বরং মানুষের আয় বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই ভ্যাট এবং আয়কর থেকে সরকারের আয় বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, ‘সরকারের হাতে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে। শুধু অবকাঠামো উন্নয়নই নয়, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি যেমন— ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মতো জনহিতকর প্রকল্পগুলো অব্যাহত রাখতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। তাই ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং কর আদায়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।’

সংবাদ ব্রিফিংয়ে উপদেষ্টা আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণার কথা জানান। এক, বই পড়া প্রতিযোগিতা: সারাদেশে ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে পাঠাভ্যাস ও বই পড়ার আগ্রহ তৈরি করতে শিগগিরই একটি বড় ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। দুই, স্থাপত্য ও ইতিহাস সংরক্ষণ: চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র এবং জিয়া স্মৃতি জাদুঘরসহ ইতিহাস বিজড়িত বিভিন্ন স্থাপত্য ও জাদুঘর সংরক্ষণের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

এসএইচআর/এমএআর/