বিজ্ঞাপন

বিরোধী দলের আপত্তি

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিল

অ+
অ-
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিল

বিরোধী দলের সদস্যদের আপত্তি উপেক্ষা করে জাতীয় সংসদে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালায় (রহিতকরণ) বিল-২০২৬ ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল-২০২৬ পাস হয়েছে। এর ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা বহুল আলোচিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬ এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫ বাতিল হলো।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এই অধ্যাদেশ তিনটি রহিতকরণের লক্ষ্যে ওই বিল দুটি উত্থাপন করেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১২তম দি বিল দুটি পাসে আপত্তি জানায় বিরোধী দল।

সংসদে বক্তব্য উত্থাপন করেন বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. নাজিবুর রহমান ও এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। তবে সেই আপত্তি কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। পরে বিল দুটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় বিচার বিভাগ আবার আগের অবস্থায় ফিরছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের আর কোনো আইন থাকছে না। তবে ওই অধ্যাদেশের অধীনে ২৫ জন বিচারকের নিয়োগসহ যেসব ব্যবস্থা ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে সেগুলো বৈধ বলে গণ্য হবে।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ (সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ও এর সংশোধনী অধ্যাদেশ) বাতিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই অধ্যাদেশের অধীনে প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত হবে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে ন্যস্ত বাজেট, গৃহীত প্রকল্প ও কর্মসূচি সরকারের আইন ও বিচার বিভাগের কাছে হস্তান্তরিত হবে এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের জন্য সৃজিত পদগুলো বিলুপ্ত হবে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে কর্মরত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের চাকরি আগে যে আইনে পরিচালিত হতো আবার সে আইনের অধীনে ন্যস্ত ও পরিচালিত হবে।

বিজ্ঞাপন

আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল সংসদে বিবেচনার জন্য উত্থাপন করলে তাতে আপত্তি জানিয়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, এই বিলটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ, স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন। ফ্যাসিবাদী কায়দায় নিম্ন আদালতকে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। আগে মন্ত্রণালয়ের কথা না শুনলে বিচারকদের খাগড়াছড়ি বদলি করা হতো, সেটা আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পরিবর্তন অসাংবিধানিক বলা হয়েছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অধ্যাদেশ জারি ও কার্যকর করা হয়েছিল। সেখানে বর্তমান আইনমন্ত্রীও ছিলেন। এখন আইনমন্ত্রী কীভাবে এটা রহিত করার বিল আনেন? 

তিনি আরও বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপি সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) দেয়নি। এখন কেন রহিতকরণ বিল আনা হচ্ছে, জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে? রহিতকরণ বিলটি অসাংবিধানিক। 

বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোর আহ্বান জানান তিনি। জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, সুপ্রিম কোর্ট কোনো আইন অসাংবিধানিক কি না সেটা বলতে পারে। কিন্তু সংসদকে কোনো আইন করার জন্য ‘ডিক্টেট’ করতে পারে না। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট বিশ্বের অন্যতম সেরা কোর্ট যেখানে বিচারকদের চাকরি, বদলি, পদায়ন সব সাংবিধানিকভাবে সংরক্ষিত। কিন্তু সে স্বাধীনতার অপব্যবহার হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদের জন্ম দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমানের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বিচারকেরা বিচারের নামে ট্রাইব্যুনালে বসে ওনার পূর্ব পুরুষ, ওনার পিতাদের ফাঁসি দিয়েছিলেন। সে সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেত্রী, গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী, বাংলাদেশের হৃৎপিণ্ড বেগম খালেদা জিয়াকে ৫ বছর থেকে ১০ বছর জেল দিয়েছিলেন। সে সুপ্রিম কোর্ট এতটাই স্বাধীন যে, সে সুপ্রিম কোর্টের জাজদের বিচার আমরা করি নাই।’

বিরোধী দলের নেতাদের সাজা দেওয়ার জন্য রাতে মোমবাতি জ্বালিয়েও বিচারকাজ করা হয়েছে, উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও একজনকেও সুপ্রিম কোর্ট ডিসিপ্লিনি প্রসিডিউরের আওতায় আনেনি। সুপ্রিম কোর্ট এতটাই স্বাধীন যে এখানে সরকারের হাত দেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। তাই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে অধিকতর পরামর্শ ও যাচাই-বাছাই করে আইনটি পাস করা হবে।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিলে আপত্তি জানান বিরোধী দলের সদস্য আখতার হোসেন। আগের বিলে আইনমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে আখতার হোসেন বলেন, এখানে মূল সংকট বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। ঘুড়ির নাটাই হাতে রেখে আকাশে উড়ার যতই স্বাধীনতা দেওয়া হোক না কেন, টান দিলে ঘুড়ি হাতে চলে আসবে। এই অধ্যাদেশ জারির আগে বিচারক নিয়োগের বিধানে এ রকম একটা পরিস্থিতি ছিল।

বিদ্যমান সংবিধানের বিধান উল্লেখ করে আখতার হোসেন বলেন, বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ার সময় রাষ্ট্রপতিকে অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে সেটা করতে হয়। তখনই শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদের মতো, ‘মানিক চোরার মতো’ ব্যক্তিরা ‘হাসিনার দ্বারা’ বিচারপতি নিয়োগ হয়েছিল। এ ধরনের একটা পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামনের দিনে চলুক, এটা তো আমরা কেউই চাই না। 

আখতার হোসেন আরও বলেন, সংবিধানে বিচারক নিয়োগে আইন করার কথা বলা আছে। কিন্তু এত বছরে সেটা করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর কথামতো বিচারপতি নিয়োগের বিধান ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সেখানে পরিবর্তন এনেছিল। একটা অধ্যাদেশ তারা করেছেন। সেখানে অসাংবিধানিক কিছু নেই। এটাকে অসাংবিধানিক ঘোষণার জন্য একটা রিট হয়েছিল উল্লেখ করে আখতার বলেন, তখন বর্তমান আইনমন্ত্রী অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। তার দপ্তর তখন এই আইনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছিল, এ আইনে কোনো অসাংবিধানিকতা (সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক) নেই। এই অধ্যাদেশে বিচারক নিয়োগে ‘জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠনের কথা আছে। এখানে কিছু শর্তের কথা বলা হয়েছে, কিছু যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। যে যোগ্যতাগুলো অতীতে কখনোই পরিপালন করা হয়নি। সে কারণে শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদের মতো, মানিকের মতো বিচারক তৈরি হয়েছিল।

অধ্যাদেশটিকে সুন্দর আইন অভিহিত করে আখতার হোসেন বলেন, সে আইনটাকে কেনও, কোনো যুক্তিতে বাতিল করে দেওয়া হবে? জুলাই সনদে বিচারক নিয়োগে আলাদা কাউন্সিল করার কথা বলা আছে। সেখানে বিএনপি এটা সংবিধানে যুক্ত না করে আলাদা আইন করার কথা বলেছিল। এখন কেন তারা সেটা মানে না?

জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, থিওরিটিক্যালি (তাত্ত্বিকভাবে) তিনি বিরোধী দলের সদস্যের বক্তব্যের সঙ্গে একমত। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে অতীতে বিশেষ করে গত ১৭ বছরে দলীয় ক্যাডারদের নিয়োগ দিয়ে বিচার বিভাগকে কলঙ্কিত করা হয়েছে। আমরা চাই, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হোক। 

তিনি বলেন, আমি তখন অ্যাটর্নি জেনারেল তথা রাষ্ট্রের আইনজীবী হিসেবে ওই সময় ডিফেন্ড করেছিলাম। রাষ্ট্রের আইনজীবী সরকারের নির্দেশনা অনুসরণ করেন। অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে যখন তিনি কথা বলেন তখন তার মক্কেল সরকারের কথা বলেন। এখন এই সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হিসেবে কথা বলছি। সরকারের পাবলিক পলিসি হলো, বিচার বিভাগে নিয়োগের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, যোগ্যতার মানদণ্ড নিরূপণের জন্য আমরা নতুন করে পদক্ষেপ গ্রহণ করব। সেটা জুলাই সনদের আলোকেই করবো।

আখতার হোসেনের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, আপনি বিচারক নিয়োগের যে স্বচ্ছতার কথা বলছেন, আপনি যে মানদণ্ডের বিচারক চান, আপনি যে সুপ্রিম কোর্ট চান, আপনি যে বিচার বিভাগের মানদণ্ড চান, আপনি যে বিচারালয় চান, আমরাও সেই বিচারালয় চাই। আমরাও চাই না, বাংলাদেশে আর কোনো মানিকের জন্ম হোক। 

পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদকে জানান, একজন বিচারপতির নামের সঙ্গে একটা বিশেষণ যুক্ত করে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। সেটা এক্সপাঞ্জ করা হলো।

এমএসআই /এসএম

বিজ্ঞাপন