রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তান। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ এই এলাকা দিয়ে যাতায়াত করে। একসময় এখানকার ফুটপাত দিয়ে হাঁটা ছিল দুঃসাধ্য; সড়কে যানজট ছিল নিত্যসঙ্গী। কারণ, ফুটপাত ও সড়ক দুই জায়গাতেই হকাররা অস্থায়ী দোকান বসাতেন। দিনে দিনে যা একরকম স্থায়ী রূপ নিয়েছিল।
সম্প্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এখানে যৌথ অভিযান চালিয়ে ফুটপাত ও সড়কের অস্থায়ী দোকান-পাট উচ্ছেদ করে। এতে এলাকাটির চিত্র পাল্টে যায়; হকারমুক্ত ফুটপাতে পথচারীরা স্বস্তিতে হাঁটার সুযোগ পান; দখলমুক্ত সড়কে ফিরে আসে যানবাহনের গতি। যানজট কমে আসায় জনমনে স্বস্তি আসে।
তবে সেই স্বস্তির আয়ু বুঝি বড়ই সংক্ষিপ্ত! গত কয়েক দিনের চিত্র বলছে, গুলিস্তান আবার তার পুরোনো রূপে ফিরে যাচ্ছে। ফের পুরোনো বিশৃঙ্খলার আবর্তে নিমজ্জিত হচ্ছে এলাকাটি। সিটি কর্পোরেশন ও প্রশাসনের নজরদারি শিথিল হওয়ার সুযোগে ফের দখল হয়ে যাচ্ছে ফুটপাত ও সড়ক। ফলে গতি পেয়েও ফের গতি হারাতে বসেছে চিরচেনা গুলিস্তান।
এ মাসের (এপ্রিল) শুরু থেকে গুলিস্তান এলাকায় শুরু হয়েছিল অবৈধ দোকান উচ্ছেদ অভিযান। ১ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত টানা উচ্ছেদ অভিযান চলে। এরপর ৮ ও ৯ এপ্রিল আবার গুলিস্তান ও বায়তুল মোকাররম এলাকায় বড় পরিসরে অভিযান চালানো হয়। ৯ এপ্রিল গুলিস্তান আন্ডারপাস এলাকার ফুটপাতে বুলডোজার দিয়ে অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব অভিযানে জিপিও লিংক রোড, গোলাপ শাহ মাজার এলাকা এবং বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখলমুক্ত করা হয়।
কিন্তু গতকাল বুধবার পুরো গুলিস্তান সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ এলাকায় ফের হকাররা তাদের অস্থায়ী দোকান বসিয়েছেন। আবারও দখল হয়ে গেছে এলাকার বেশিরভাগ ফুটপাত। কোথাও কোথাও ফুটপাতে হকারদের অস্থায়ী পাটাতনগুলো রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে পড়ে রয়েছে, সেখানে এখনও দোকান বসায়নি তারা, কিন্তু দোকান সরায়ওনি। দুই-একদিনের মধ্যে দোকান বসিয়ে ফেলবে তারা।
গুলিস্থান জিরো পয়েন্ট, জিপিওর পাশের ফুটপাত, পীরইয়ামিনি মার্কেটের বিপরীত পাশের রাস্তা, গোলাপশাহ মাজার এলাকা, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের আশপাশ এলাকা জুড়ে নতুন করে হকাররা বসে পড়েছেন। এতে করে ফুটপাত ধরে আর হাঁটতে পারছেন না পথচারীরার। বাধ্য হয়ে তারা সড়কে নেমে এসে হাঁটছেন। এতে যানবাহনের গতি কমছে এবং যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।
জিরো পয়েন্ট পেরিয়ে গোলাপ শাহ মাজারের দিকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন পথচারী খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, উচ্ছেদ অভিযানের পর কয়েকদিন ফুটপাতে কোনো দোকান বা হকার ছিল না। ফলে ফুটপাত ধরে হাঁটাচলা করা যাচ্ছিল। এখন আবার ফুটপাত দখল হতে শুরু করেছে। তাই সড়ক দিয়েই হাঁটতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, উচ্ছেদ অভিযানের পর মানুষ ও যানবাহন চলাচলে গতি ফিরে এসেছিল। এখন আবার গতি হারাতে শুরু করেছে।
সদরঘাট থেকে টঙ্গীর দিকে চলাচলকারী ভিক্টর বাসের চালক আব্দুল আওয়াল বলেন, অভিযানের পর পুরো এলাকা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। তেমন যানজট হতো না। ৫/১০ মিনিটে গুলিস্তান পার হয়ে যেতাম। এখন আবার ফুটপাতে দোকান বসেছে, পথচারীরা ফুটপাত ছেড়ে সড়ক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। এতে যানজট হচ্ছে। আমাদের সময়ও বেশি লাগছে এ টুকু পথ পার হতে।
গোলাপ শাহ মাজারের দিকে যেতে ফুটপাতে বাচ্চাদের পোশাক নিয়ে একটি চৌকি বসিয়েছেন হকার জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, দোকান না বসালে পরিবার নিয়ে খাব কী? উচ্ছেদ অভিযানের পর কয়েকদিন দোকান বসাইনি। তখন কোনো আয় ইনকাম ছিল না, সংসার চলে না। এদিকে সামনে ঈদ, ঋণ করে কিছু মালামাল কিনেছিলাম। তাই বাধ্য হয়ে দোকান বসিয়েছি।
তিনি বলেন, আমাদের জন্য বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না করে শুধু উচ্ছেদ করে দিলে আমরা কীভাবে মানবো। আমাদের বসার জায়গা, ব্যবসা করার পথ করে দিয়ে সরকার উচ্ছেদ করুক। এসব ব্যবস্থা না করে আমাদের তুলে দিলে পরিবার নিয়ে আমরা চলব কীভাবে, খাব কী?
মাজারের বিপরীতে ফুটপাতে দোকান নিয়ে বসা আরেক হকার এরশাদ আলী বলেন, যেহেতু আমাদের বিষয়ে কোনো সমাধান করা হয়নি তাই বাধ্য হয়ে আবার ফুটপাতে দোকান বসিয়েছি। কয়েক দিন কেউ দোকান বসায়নি। কিন্তু সরকার, সিটি কর্পোরেশন বা পুলিশের পক্ষ থেকে আমারা কী করব, কোথায় বসব এমন কোনো ব্যবস্থা বা সমাধান করা হয়নি। আমরা ফুটপাত ছেড়ে দিতে চাই। কিন্তু আমাদের একটা কিছু ব্যবস্থা করে দিক, তারপর ছাড়ব।
গুলিস্তান এলাকায় দায়িত্ব পালন করা ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, উচ্ছেদ অভিযানের পর কয়েক দিন এলাকাটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। ভালোই দেখাচ্ছিল। সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারছিল। কিন্তু হকাররা আবার বসতে শুরু করেছে। আবার আগের মতো হয়ে যাবে মনে হচ্ছে। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে হকারদের তুলে দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ চলে গেলে তারা আবার বসে পড়ে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করতে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। পথচারীদের ফুটপাত ধরে নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে কাজ করা হচ্ছে। গুলিস্তান এলাকায় সুযোগ বুঝে হকাররা মাঝে মাঝে বসতে শুরু করেছে, এমন অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। আমরা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
দক্ষিণ সিটির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, রাস্তায় যত্রতত্র ব্যবসা করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা যাবে না। তবে আমরা হকারদের প্রতি অমানবিকও হতে চাই না। ফুটপাতে অস্থায়ী ব্যবসা করতে হলে সিটি কর্পোরেশন থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। বর্তমানে পুলিশের সহযোগিতায় এলাকাভিত্তিক হকারদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তালিকা সম্পন্ন হলে নির্দিষ্ট এলাকায়, নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট সংখ্যক হকারকে বসার অনুমতি দেওয়া হবে। হলিডে মার্কেট ও নৈশকালীন মার্কেট চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আমরা তাদের শুধু উচ্ছেদ নয়, পুনর্বাসনও করতে চাই।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল হাশিম কবির বলেন, উচ্ছেদের নামে প্রতিদিন ব্যাপক ভাঙচুর করা হচ্ছে, মালামাল নষ্ট করা হচ্ছে। হাজার হাজার স্বল্প পুঁজির হকার মালামাল হারিয়ে, রুটি-রুজির জায়গা থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। এই মানুষগুলো সর্বশান্ত অবস্থায় পরিবার-পরিজন নিয়ে অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ চলবে না। আমরা চাই, দ্রুত লাইসেন্স দিয়ে হকারদের সংকট সমাধান করা হোক। কারও সুযোগ থাকলে সে রাস্তায় হকারি করে না। আমরাও এর সমাধান চাই।
সার্বিক বিষয় নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, শুধু উচ্ছেদ করেই হকারদের সমস্যার সমাধান করা যাবে না। তাদের জন্য স্থায়ী সমাধানের পথ বের করতে হবে। তাদের ডাটাবেজ তৈরি করার মাধ্যমে ঋণ, পুনর্বাসন, নির্দিষ্ট হকার জোন, হলিডে মার্কেট, নাইট মার্কেট সুবিধার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সমাধানের পথ খুঁজতে, উদ্যোগ গ্রহণ করতে সব পক্ষকেই স্থায়ী এবং কার্যকর সমাধানের পথে এগোতে হবে।
এএসএস/বিআরইউ
