রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাইম আহমেদ টিটন (৫৫) নিহত হওয়ার ঘটনায় আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলালকে প্রধান আসামি করে মামলা করা হয়েছে। নিহতের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন বাদী হয়ে নিউমার্কেট থানায় মামলাটি দায়ের করেন। তবে আলোচিত এই হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, টিটন গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর থানার খাপুরা এলাকার বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর গত বছরের ১৩ আগস্ট আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান। এরপর ঢাকার হাজারীবাগের সুলতানগঞ্জ এলাকার একটি বাসায় বসবাস শুরু করেন।
এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, টিটন অতীতে পরিবারের আর্থিক ক্ষতির জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করে বড় ভাইয়ের সঙ্গে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তিনি নতুন করে ব্যবসা শুরু করার চেষ্টা করছিলেন এবং একটি গরুর হাটের ইজারা (শিডিউল) কেনার কথা জানান।
এজাহারে ঘটনার পেছনে গরুর হাটের ইজারা (শিডিউল) নিয়ে বিরোধকে দায়ী করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এই ইজারা নিয়ে ইমামুল হাসান হেলাল (পিচ্চি হেলাল), বাদল (কিলার বাদল/কাইল্লা বাদল), শাজাহান ও রনিসহ (ভাঙ্গারি রনি) কয়েকজনের সঙ্গে টিটনের বিরোধ তৈরি হয়।
২৭ এপ্রিল টিটন তার বড় ভাইকে ফোন করে জানান, প্রতিপক্ষ তাকে ডেকেছে এবং তারা সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করতে চায়। পরের দিন ২৮ এপ্রিল সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা ৫০ মিনিটে ঢাবির শাহনেওয়াজ হোস্টেলের সামনে বটতলায় পাকা সড়কে টিটনের ওপর হামলা চালানো হয়। মোটরসাইকেলে করে আসা দুইজন অস্ত্রধারী ব্যক্তি এবং তাদের সঙ্গে থাকা আরও পাঁচ থেকে সাতজনের পরিকল্পনায় টিটনকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়।
গুলিতে তার ডান কানের উপরের অংশ, বাম ভ্রুর উপরের কপাল, পিঠের বাম পাশের নিচে ও ডান পাশের উপরের অংশ, বাম হাতের কনুইয়ের উপরের সামনের দিক ও নিচের অংশ এবং বাম বগলের নিচে গুরুতর আঘাত লাগে। এতে তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, ঘটনার খবর পেয়ে বাদী যশোর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে ২৯ এপ্রিল ভোর আনুমানিক ৬টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পৌঁছে ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করেন। তিনি নিউমার্কেট থানা পুলিশের প্রস্তুত করা সুরতহাল রিপোর্টের সময় উপস্থিত ছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে থানায় মামলা করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে নিউমার্কেট থানায় এসে তিনি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় উল্লেখিতদের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বাদী।
পুলিশের একটি সূত্রে জানা যায়, পিচ্চি হেলালের হয়ে হত্যার পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন রায়ের বাজারের জুয়েল রাজ, নাক্কা সোহেল, লালমাটিয়ার জাহিদ হোসেন মোড়ল ও জাকির হোসেন রোডের মেহেদী হাসান রুবেল (তারচোর রুবেল)।
পুলিশের আরেকটি সূত্রে জানা যায়, বাদল ওরফে কাইল্লা বাদলের স্ত্রীকে টিটন একটি বাসায় রাখেন। এই নিয়ে কাইল্লা বাদলের সাথে তার দ্বন্দ্ব চলছিল। ধানমন্ডি এলাকায় মাটির নিচ দিয়ে ডিপিডিসির কাজ চলছে। জাকির হোসেন রোডের মেহেদী হাসান রুবেল ওরফে 'তার চোর রুবেল' সেখান থেকে প্রচুর তার চুরি করে সেগুলো লক্ষ লক্ষ টাকায় বিক্রি করে। এই তার চুরির ঘটনায় টিটন তার কাছে ভাগ চায়। তার সাথেও টাকা ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল।
পুলিশের আরেকটি সূত্র থেকে জানা যায়, জেল থেকে বের হওয়ার পর সে শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের সাথে যোগ দেয়। এ নিয়ে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল হক ইমনের সাথে দ্বন্দ্ব চলছিল। টিটন সাজেদুল হক ইমনের ছোট বউ নীলার বড় ভাই। তবে মামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের নাম দেননি নিহত টিটনের ভাই।
এদিকে বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, এই হত্যার ঘটনায় গোয়েন্দারা মাঠে কাজ করছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজনকে শনাক্তও করা হয়েছে। দ্রুত একটা ভালো ফলাফল মিলবে।
২০০১ সালে সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় দুই নম্বরে থাকা টিটন ছিলেন দেশের অপরাধজগতের পরিচিত নাম। পুলিশের ধারণা, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরেই তিনি হত্যার শিকার হয়েছেন।
১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে স্থানীয় অপরাধী চক্রের মাধ্যমে অপরাধজগতে প্রবেশ করে টিটন ধীরে ধীরে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। একাধিক হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়া ছাড়াও তিনি অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। তার বিরুদ্ধে বহু হত্যা মামলা ছিল, যার মধ্যে ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা অন্যতম।
১৯৬৬ সালে জন্ম নেওয়া টিটনের বাবা কে এম ফখরুদ্দিন এবং মা আকলিমা বেগম। ২০০৪ সালে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় তিনি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। তবে ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান।
এসএএ/এসএএস
