বিজ্ঞাপন

উনুনে আগুন জ্বলবে কি না, ঠিক করে দেয় ভোরের রাজপথ

উনুনে আগুন জ্বলবে কি না, ঠিক করে দেয় ভোরের রাজপথ

ভোর ৬টায় কোদাল হাতে রাস্তার ধারে এসে বসেন সাজল মিয়া। মাটি কাটার কাজ করেন তিনি। দৈনিক মজুরি ৬০০ টাকা। কিন্তু এই কাজও নিয়মিত জোটে না। টানা এক সপ্তাহ ধরে কোনো কাজ পাননি। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়, তবু আসে না কোনো কাজের ডাক। সরকারি ছুটি কিংবা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসেও তার জীবনে নেই কোনো বিরতি। কাজ পেলে পেট ভরে, নয়তো উনুনে জ্বলে না আগুন; পরিবার নিয়ে থাকতে হয় আধপেটা বা না খেয়ে।

রাজধানীর নতুনবাজার মোড়ের ফুটপাতে গড়ে ওঠা শ্রমবাজারে প্রতিদিনই ভিড় করেন এমন শত শত নারী-পুরুষ শ্রমিক। এখানেই কাজের খোঁজে দাঁড়িয়ে থাকেন সাজল মিয়ারা। এই বাজারে রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি ও গৃহস্থালি কাজের লোক পাওয়া যায়। এমনকি দারোয়ান, ভ্যানচালক কিংবা মেথরের সন্ধানেও অনেকে এই শ্রমবাজারে ছুটে আসেন। তবে, আগের তুলনায় কাজ কমে গেছে বলে জানান শ্রমিকরা

সাজলের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায়। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ঢাকায় থাকছেন। বয়স ৪০ পেরিয়ে যাওয়ায় পেশা বদলের চিন্তা আর করেন না। দিনমজুরির কাজ করেই জীবনের চাকা ঘোরাতে হয় তাকে। মা-বাবা, স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে সাতজনের সংসার তার। মাসে ১৮-২০ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু প্রতিদিন কাজ না পাওয়ায় চলতে হয় ধারদেনা করে।

রাজধানীর নতুনবাজার মোড়ের ফুটপাতে গড়ে ওঠা শ্রমবাজারে প্রতিদিনই ভিড় করেন এমন শত শত নারী-পুরুষ শ্রমিক। এখানেই কাজের খোঁজে দাঁড়িয়ে থাকেন সাজল মিয়ারা। এই বাজারে রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি ও গৃহস্থালি কাজের লোক পাওয়া যায়। এমনকি দারোয়ান, ভ্যানচালক কিংবা মেথরের সন্ধানেও অনেকে এই শ্রমবাজারে ছুটে আসেন। তবে, আগের তুলনায় কাজ কমে গেছে বলে জানান শ্রমিকরা।

“লজ্জায় সব কথা বলতে পারি না। আমাদের কথা শোনার মতো কেউ নেই। কাজ না থাকলে এমন দিনও গেছে, তিন বেলার মধ্যে একবেলাও খেতে পারিনি”
- ঢাকার শ্রমবাজারের চিত্র

সাজল মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে কোনো কাজ পাইনি। কয়েক দিন ধরে এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে। আজ ভোর ৬টার দিকে এসেছি। কিন্তু ১০টা পর্যন্ত কোনো কাজের সন্ধান বা ডাক আসেনি। ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষার পর বাসায় চলে যাব। কাজ না থাকায় একবেলা খেলে দুবেলা উপোস থাকতে হয়। এক বছর ধরে তেমন আয় নেই। কিন্তু খরচ তো থেমে থাকে না, তাই ধারদেনা করে চলতে হয়।’

গেল দুদিন চুলায় কোনো আগুন জ্বলেনি বলে জানান এই দিনমজুর। টাকা না থাকায় কেউ এখন ধারও দিতে চান না। এজন্য মহল্লার এক দোকান থেকে দুই কেজি চাল ও পালং শাক বাকিতে কিনে রাতে বাড়ি ফেরেন। রাতের খাবার শেষে অবশিষ্ট কিছু ভাত আর শাক নিয়ে সকালে কাজের খোঁজে আসেন শ্রমবাজারে। কাজ না পেলে এই খাবারটুকুও বাসায় নিয়ে ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে ভাগ করে খেতে হবে বলে জানান সাজল মিয়া।

আক্ষেপ করে এই দিনমজুর জানান, মাটি কাটার কাজের মজুরি ৮০০ টাকা। কিন্তু সরদারের (মধ্যস্বত্বভোগী) মাধ্যমে গেলে হাতে পান ৬০০ টাকা। বাকি টাকা সরদার কেটে নেন। প্রতিবাদ করলে কাজ না পাওয়ার ভয় থাকে। এজন্য নিজের কষ্টের টাকা হাতছাড়া হলেও কোনো আপত্তি করতে পারেন না তারা।

“অল্প টাকায় আসলে কিছুই হয় না। পরিবার-পরিজন নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাতে হয়। অনিয়মিত আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে নানা সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়”
- ঢাকার শ্রমবাজারের চিত্র

একই শ্রমবাজারে দাঁড়িয়ে থাকা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের মো. সোলাইমানের অবস্থাও ভিন্ন নয়। একসময় অন্য পেশায় থাকলেও দুই বছর ধরে রাজমিস্ত্রির জোগালি হিসেবে কাজ করছেন তিনি। খরচ কমাতে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে গ্রামে রেখে শাহজাদপুরের একটি মেসে থাকেন। মাসে ১২ থেকে ১৫ দিন কাজ পান। এই আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সোলাইমান বলেন, ‘লজ্জায় সব কথা বলতে পারি না। আমাদের কথা শোনার মতো কেউ নেই। কাজ না থাকলে এমন দিনও গেছে, তিন বেলার মধ্যে একবেলাও খেতে পারিনি। বৃষ্টি-বাদল এলে কাজ আরও কমে যায়। তখন ভাতের বদলে রুটি-কলা খেয়ে দিন কাটাতে হয়। গত কয়েকদিন ধরে কাজ নেই। ফলে হাতে টাকা না থাকায় সামান্য খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে।’

সোলাইমানের দৈনিক মজুরি ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা। তবে, অনেক সময় দালালরা টাকা কেটে নেয় বলে অভিযোগ তার। বলেন, ‘মালিকের কাছ থেকে ঠিকমতো টাকা নেওয়া হলেও আমাদের হাতে আসে কম। অনেক সময় আবার পাওনা টাকাও বাকি রাখা হয়। এতে সংসারে ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারি না। ফলে ঝগড়া লেগে থাকে নিয়মিত। এই আয়ে নিজের চলাই এখন কষ্ট, পরিবার কীভাবে চালাব?’

“কাজ পেলে পেট ভরে, নয়তো উনুনে জ্বলে না আগুন; পরিবার নিয়ে থাকতে হয় আধপেটা বা না খেয়ে”
- ঢাকার শ্রমবাজারের চিত্র

প্রায় ২৫ বছর ধরে রাজধানীর মুগদা এলাকায় বসবাস কিশোরগঞ্জের রোকেয়ার। স্বামী মারা যাওয়ার পর নিঃসন্তান এই নারী আগে বাসাবাড়িতে রান্নাবান্নার কাজ করে সংসার চালাতেন। এখন প্রতিদিন নিজের শ্রম বেচতে ছুটে আসেন নতুনবাজারে। কিন্তু দুদিন ধরে কেউ কাজে নেননি তাকে। হতাশ না হয়ে আজও সকাল সাড়ে ৬টা থেকে এখানে অপেক্ষা করছেন। দুপুর ১২টা পর্যন্ত কাজ না মিললে তাকেও ফিরতে হবে খালি হাতে।

রোকেয়া বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। দিন আনি দিন খাই। কাজ করতে পারলে খাইতে পারি, না করলে এমনে থাহা লাগে (না খেয়ে থাকতে হয়)। আমরা ঠিকাদারের অধীনে কাজ করি, এরপরও দরদাম করতে হয় অনেকের সঙ্গে।’ ধোয়ামোছার পাশাপাশি ইট-খোয়া ভাঙার কাজ করা এই নারী শ্রমিক বলেন, ‘বর্তমান বাজারে মজুরি আগের তুলনায় কম। কারণ, সবকিছুর দাম বেড়েছে কিন্তু মজুরি বাড়েনি। নিজের আয় দিয়ে নিজেকেই চলতে হয়, তাই এক দিন কাজ না পেলে পুরো দিনটাই কষ্টে কাটে।’

তথ্য বলছে, বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক খাতনির্ভর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে কর্মরত মোট শ্রমশক্তির বিপুল অংশই এমন এক বাস্তবতার মধ্যে কাজ করছেন, যেখানে নেই লিখিত নিয়োগপত্র কিংবা চাকরির স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা। এমনকি নির্দিষ্ট মজুরি কাঠামো বা বরখাস্তের সুরক্ষাও নেই।

রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এসব শ্রমিকের জীবন একই সূত্রে গাঁথা। অনিশ্চয়তার ছায়া সবচেয়ে বেশি পড়ে তাদের সংসারে। সামাজিক নিরাপত্তা বা স্বাস্থ্যবিমার মতো মৌলিক সুবিধা তাদের কাছে প্রায় অপ্রাপ্য। ফলে সাজল-রোকেয়াদের মতো অসংখ্য শ্রমিকের জীবন প্রতিদিনই চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যায়। কারওয়ান বাজারে এমনই এক শ্রমিক সেলিম হোসেন। মাথায় এক মণেরও বেশি বোঝা বহন করেই চলে তার জীবন। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন ভোর ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তাকে এই কাজ করতে হয়। দেড়-দুই ঘণ্টা পরপর ৩০-৪০ টাকার বিনিময়ে কাজের ডাক পান তিনি।

সেলিম বলেন, ‘কাজ বেশি থাকলে দৈনিক ৫০০-৬০০ টাকা রুজি (আয়) করতে পারি। তবে, কোনো কোনো দিন ২০০-৩০০ টাকায়ও সীমাবদ্ধ থাকে। অল্প টাকায় আসলে কিছুই হয় না। পরিবার-পরিজন নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাতে হয়। অনিয়মিত আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নানা সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়। পুঁজি বা অন্য কোনো বিকল্প না থাকায় পেশাও বদলাতে পারছি না। তাই রোদ-বৃষ্টি হলেও কারওয়ান বাজারের এই কাজের খোঁজেই থাকতে হয়, নয়তো খাবার জোটা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।’

‘অসুস্থ হলেও কাজে বের হতে হয়। কারণ, আয় না হলে খাবার নাই। আসলে আমাদের তো দেখার মতো কেউ নাই’— যোগ করেন তিনি।

“মালিকের কাছ থেকে ঠিকমতো টাকা নেওয়া হলেও আমাদের হাতে আসে কম। অনেক সময় আবার পাওনা টাকাও বাকি রাখা হয়। এতে সংসারে ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারি না”
- ঢাকার শ্রমবাজারের চিত্র 

প্রতি বছর পয়লা মে গোটা বিশ্বে পালিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। বন্ধ থাকে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আয়োজন হয় নানা কর্মসূচির। কিন্তু ঢাকার ফুটপাত আর শ্রমবাজারে দাঁড়িয়ে থাকা এসব শ্রমিকের জীবনে সেই দিনেও কোনো ছুটি নেই। বরং অন্য দিনের মতোই কাজের আশায় রাস্তায় নামতে হয় তাদের। অনেকেই জানেন না দিনটির তাৎপর্য।

নতুনবাজার, কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই কাজের জন্য অপেক্ষা করছেন বহু মানুষ। পুরুষের পাশাপাশি রয়েছেন নারীরাও। কারও হাতে কোদাল-টুকরি, কারও হাতে ব্যাগ, আবার কেউ অতিরিক্ত জামা-কাপড় নিয়ে ঘুরছেন— যেন কাজের ডাক এলেই ছুটে যেতে পারেন। প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই এসব শ্রমবাজারে এসে হাজির হন তারা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে শ্রমিকের সংখ্যাও। নির্দিষ্ট সময়ে কেউ কাজ পান, আবার কাউকে ফিরতে হয় নিরাশ হয়ে।

শ্রমখাত বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে আয়ের অনিশ্চয়তা এখন অনেকটা কাঠামোগত রূপ নিয়েছে। এই খাতে শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট হলো স্থায়ী কর্মসংস্থান না থাকা। ফলে তারা দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যা দারিদ্র্যকে শুধু স্থায়ীই করে না, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে নিয়ে যায়।

এমআরআর/এমএআর/