বিজ্ঞাপন

নীরব লড়াই

১৫-তে বিয়ে, ১৮-তে মা, ১৯-এ ডিভোর্স: তবুও ঘুরে দাঁড়ানো এক নারীর গল্প

১৫-তে বিয়ে, ১৮-তে মা, ১৯-এ ডিভোর্স: তবুও ঘুরে দাঁড়ানো এক নারীর গল্প

কৈশোরেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন আমেনা বেগম। অল্প বয়সে বিয়ে, মাতৃত্ব, সংসার ভাঙনের ধাক্কা এবং অভাবসহ নানাবিধ প্রতিকূলতা মিলিয়ে শুরুটাই ছিল সংগ্রামে ভরা। তবে, দমে না গিয়ে সব বাধা জয় করে আজ তিনি একজন আত্মনির্ভরশীল পোশাক শ্রমিক। একাই বহন করছেন বৃদ্ধ বাবা ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছেলের দায়িত্ব। অভাব, কষ্ট আর সমাজের নানা বাঁকা কথা পেছনে ফেলে মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করে গড়ে তুলেছেন নতুন জীবন। নিজের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো ছেলের মধ্যে বুনে দিয়ে নীরবে লড়ে যাচ্ছেন এই অদম্য নারী।

গাজীপুরের হোপলন অ্যাপারেলস লিমিটেড নামের পোশাক কারখানায় কাজ করেন আমেনা বেগম। কাজের ফাঁকে সম্প্রতি সেখানেই কথা হয় তার সঙ্গে। তুলে ধরেন জীবনের দীর্ঘ সংগ্রাম, না বলা কষ্ট আর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। উঠে আসে দারিদ্র্য, বঞ্চনা, দায়িত্ব আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির চিত্র।

১৫ বছর বয়সে বিয়ে, ১৮-তে মা এবং ১৯ বছর বয়সে ডিভোর্সের মতো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন আমেনা বেগম। সব হারিয়ে দমে না গিয়ে, অভাব ও সমাজের বাঁকা কথা উপেক্ষা করে তিনি আজ একজন আত্মনির্ভরশীল পোশাক শ্রমিক। গাজীপুরের একটি কারখানায় মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করে গড়ে তুলেছেন নতুন জীবন। এখন তার সব হিসাব-নিকাশ শুধু ছেলের ভবিষ্যৎ ঘিরে

আমেনা জানান, বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার চৌদিঘি গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম তার। পাঁচ ভাই-বোনের সংসারে ছোট থেকেই অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকলেও তা আর এগোয়নি। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষাও দেওয়া হয়নি। পরিবারে আয় কম, সদস্য বেশি— এই বাস্তবতায় শিক্ষাজীবন থেমে যায় খুব দ্রুতই।

কৈশোরের অবহেলা আর বিচ্ছেদের ক্ষত মুছে আমেনা বেগম এখন আত্মনির্ভরশীল / ছবি- ঢাকা পোস্ট

শুধু পড়াশোনাই নয়, খুব অল্প বয়সে জীবনের বড় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন আমেনা। ২০০৪ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। তখনও তিনি বুঝে ওঠেননি সংসার কী। ২০০৭ সালে ১৮ বছর বয়সে জন্ম হয় তার একমাত্র ছেলে সন্তানের। নিজের শৈশব শেষ হওয়ার আগেই কাঁধে এসে পড়ে সংসার ও মাতৃত্বের দায়।

তবে, সেই সংসার বেশিদিন টেকেনি। স্বামীর দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ, সংসারে অশান্তি, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও শারীরিক নির্যাতন— সবমিলিয়ে দিনদিন কঠিন হয়ে ওঠে জীবন। ‘সে পাঁচ টাকা আয় করলে চার টাকাই খরচ করে ফেলত। সংসার কীভাবে চলবে, সন্তানের ভবিষ্যৎ কী— এসব নিয়ে তার কোনো চিন্তা ছিল না’— বলেন আমেনা। শেষ পর্যন্ত ১৯ বছর বয়সে বিচ্ছেদের কঠিন সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তখন তার সন্তান খুবই ছোট, মায়ের দুধের ওপর নির্ভরশীল।

বিচ্ছেদের পর কিছুদিন বাবার বাড়িতে থাকেন। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের সীমাবদ্ধতায় সেখানে দীর্ঘদিন থাকা সম্ভব ছিল না। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। সন্তানকে মায়ের কাছে রেখে ঢাকায় চলে আসেন কাজের সন্ধানে। সেই সময়টা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি।

আমেনার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য এখন এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছেলেকে (আমিনুর রহমান হৃদয়) মানুষ করা। নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে, দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি করে ছেলের পড়াশোনা ও বৃদ্ধ বাবার দায়িত্ব একাই সামলাচ্ছেন তিনি। অভাবের সংসারে হিসাব করে চলে ছেলের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই এই অদম্য নারীর প্রতিদিনের লড়াই

আমেনা বেগম বলেন, ‘ঢাকায় এসে শুরু হয় নতুন লড়াই। কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই ২০১৬ সালে একটি পোশাক কারখানায় হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করি। মেশিন কীভাবে চালাতে হয়, কাজ কীভাবে করতে হয়, কিছুই জানতাম না। প্রথমদিকে নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। প্রায় এক বছর হেলপার হিসেবে কাজ করার পর ধীরে ধীরে কাজ শিখে নেই। পরে অপারেটর হিসেবে কাজ শুরু করি। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এখন আমি দক্ষ মেশিন অপারেটর। শুরুতে খুব কষ্ট ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে শিখে নিয়েছি। এখন কাজটাই আমার ভরসা।’

অভাবের সংসারে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ছে ছেলে, বসছে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায়, জানান আমেনা বেগম / ছবি- ঢাকা পোস্ট

তিনি জানান, চাকরির শুরুতে তার বেতন ছিল ৫ হাজার ৬০০ টাকা। বর্তমানে তিনি মাসে ১৬ হাজার ৪০০ টাকা পান, সঙ্গে রয়েছে ওভারটাইম। এই আয়ের ওপর নির্ভর করেই চলছে পুরো সংসার।

আমেনার জীবনের কেন্দ্র এখন তার ছেলে আমিনুর রহমান হৃদয়। ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে থাকলেও ২০২০ সালে মায়ের মৃত্যুর পর ছেলেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন তিনি। বর্তমানে উত্তরা এলাকার একটি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ছে হৃদয়। সে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। ছেলের পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ— সবকিছু ঘিরেই এখন আমেনার জীবন।

সমাজের বাঁকা কথা উপেক্ষা করে একাই লড়ছেন জীবনযুদ্ধে, নিঃস্ব অবস্থা থেকে আজ তিনি সফল মা ও লড়াকু নারী / ছবি- ঢাকা পোস্ট

ছেলেকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আমেনা। বলেন, ‘আমার নিজের কোনো স্বপ্ন নাই। এখন একটাই স্বপ্ন— ছেলেকে মানুষ করা। আমি যা পারি নাই, সে যেন সেটা করতে পারে। আমি পাঁচ টাকা খরচ করতেও ভাবি, এই টাকা যদি ছেলের কাজে লাগে। ছেলেই আমার সব, ওর জন্যই আমার সবকিছু। ও ভালো কিছু করতে পারলেই আমার জীবন সার্থক। ওর সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ হলেই আমি শান্তি পাই।’

অবশ্য একাই সংসার চালাতে গিয়ে প্রতিটি খরচ হিসাব করে চলতে হয় তাকে। মাস শেষে বেতনের বড় একটি অংশ যায় ছেলের পড়াশোনা, বাসাভাড়া ও দৈনন্দিন খরচে। নিজের জন্য বাড়তি কিছু রাখার সুযোগ খুব কমই হয়। ‘একটা আইসক্রিম খেতেও ভাবি যে, এই টাকা ছেলের কাজে লাগবে কি না’— বলেন আমেনা।

শুধু ছেলের দায়িত্বই নয়, বৃদ্ধ বাবার দেখাশোনার দায়িত্বও তার কাঁধে। কর্মজীবনের শুরু থেকেই বাড়িতে টাকা পাঠিয়েছেন। বাবার জন্য গরু কিনে দিয়েছেন, জমি কিনেছেন নিজের কষ্টার্জিত টাকায়। বর্তমানে তাদের কিছু জমি রয়েছে, যার একটি অংশ বাবা দেখাশোনা করেন। মায়ের অসুস্থতার সময় চিকিৎসার ব্যয়ও বহন করেছেন তিনি, যদিও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচাতে পারেননি।

সংসার ভাঙার পর পরিবার ও বিভিন্ন জায়গা থেকে আবারও বিয়ের প্রস্তাব এলেও তা গ্রহণ করেননি আমেনা। তার মতে, নতুন সংসার করলে সন্তানের প্রতি মনোযোগ কমে যেতে পারে। বললেন, ‘আমি চাইনি আমার ছেলেটা অবহেলায় বড় হোক। তাই নিজের জীবন নিয়ে আর ভাবিনি।’

জীবনযুদ্ধে হার না মানা এই পোশাক শ্রমিকের প্রতিদিনের জীবনও কম কষ্টের নয়। ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে নামাজ ও রান্না করেন। সকাল ৮টায় কাজে যান। কারখানায় টানা কাজ শেষে বিকেলে বাসায় ফিরে আবার রান্নাবান্না, ছেলের দেখাশোনা, ঘরের কাজ— সব সামলান একাই। রাত ১০টা-১১টার দিকে শেষ হয় তার দিনের কাজ। সপ্তাহে এক দিন ছুটি থাকলেও সেই দিনেও বিশ্রামের সুযোগ খুব কম।

তবে, নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অন্য নারীদের জন্য একটি বার্তাও দিয়েছেন তিনি। বললেন, ‘জীবনে একটা কিছু হারালেই সব শেষ হয়ে যায় না। নতুন করে শুরু করা যায়। যারা কষ্টে ভেঙে পড়ে বা নিজেকে শেষ করে দেয়, তারা ভুল করে। ধৈর্য ধরতে হবে, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।’

শুধু আমেনা বেগম নন, তার মতো এমন অসংখ্য নারী শ্রমিক প্রতিদিন নীরবে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। এই অদম্য লড়াকু নারীদের সবার প্রতি মহান মে দিবসের লাল সালাম / ছবি- ঢাকা পোস্ট

আমেনা বলেন, ‘আমি শূন্য থেকে শুরু করে নিজের চেষ্টায় ঘুরে দাঁড়িয়েছি। আমার জীবনের সব হিসাব-নিকাশ এখন একটাই। সেটি হচ্ছে— ছেলের ভবিষ্যৎ। আর সেই ভবিষ্যৎ গড়তেই প্রতিদিন নতুন করে লড়াই শুরু করি।’
অবশ্য জীবনের এমন উত্থান-পতনের পর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প শুধু আমেনা বেগমের নয় বরং এই কারখানার হাজারো নারী শ্রমিকও প্রতিদিন ব্যক্তিগত সংগ্রাম ও দায়িত্বের ভার সামলে এগিয়ে যাচ্ছেন। এই পথচলায় হপ লুন অ্যাপারেলস লিমিটেড তাদের জন্য একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল ও সহায়ক কর্মপরিবেশ গড়ে তুলেছে, যা তাদের টিকে থাকা ও এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগাচ্ছে।

এ বিষয়ে হপ লুন অ্যাপারেলস লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, কর্মীদের আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা বজায় রাখতে আমরা একটি নিরাপদ, সম্মানজনক এবং সহায়ক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করি। আমরা ন্যায্য মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেই।

তিনি আরও বলেন, কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, উন্মুক্ত যোগাযোগ এবং বিভিন্ন কর্মী সম্পৃক্ততা কার্যক্রম আমাদের প্রতিষ্ঠানে একটি ইতিবাচক কর্মপরিবেশ তৈরি করে। আমরা বিশ্বাস করি যে, নারী কর্মীদের ক্ষমতায়ন এবং কাজ-জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখার উদ্যোগগুলো তাদের আস্থা আরও দৃঢ় করে।

আরএইচটি/এমএআর/