অভাবের সংসারে শৈশবে বই হাতে তোলার সুযোগ হয়নি। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে ঠেলে দিয়েছে শ্রমবাজারে। কিন্তু থেমে থাকেননি তিনি। সময়ের ব্যবধান পেরিয়ে, জীবনের নানা প্রতিকূলতা জয় করে আবারও বর্ণমালার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়েছেন ৩২ বছর বয়সি পোশাক শ্রমিক শাবনূর।
এমন বর্ণমালার সঙ্গে নতুন করে বন্ধুত্ব গড়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে গাজীপুরের ‘হপ লুন অ্যাপারেলস লিমিটেড’-এর একটি ভিন্নধর্মী উদ্যোগ। হংকংভিত্তিক কোম্পানিটি শ্রমিকদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে ‘SheCAN’ (শি ক্যান) প্রজেক্টের আওতায় এখানে ৫ম থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সপ্তাহে দুই দিন (শনিবার ও মঙ্গলবার) কাজের বিরতিতে দুই ঘণ্টা করে ক্লাস হয়। বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে নিয়মিত পাঠ নিচ্ছেন প্রায় ৩৫ জন নারী পোশাকশ্রমিক, যারা কোনো এক সময় আর্থিক বা পারিবারিক কারণে পড়াশোনা থেকে ছিটকে পড়েছিলেন।
সম্প্রতি ঢাকা পোস্টের সঙ্গে কথা বলেন এই কারখানার মেশিন অপারেটর শাবনূর। আলাপচারিতায় উঠে আসে তার জীবনের সংগ্রাম, হারিয়ে যাওয়া শৈশব, আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করার গল্পসহ নানা অভিজ্ঞতার কথা।
শাবনূর জানান, তার জীবন শুরু হয়েছিল ময়মনসিংহের শেরপুরের এক অজ পাড়াগাঁয়ে, যেখানে দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী। পাঁচ বোন আর এক ভাইয়ের সংসারে তার শৈশবটা হারিয়ে গিয়েছিল প্রয়োজনের চাপে। বাবা ছিলেন একজন রিকশাচালক। ‘দিন আনে দিন খায়’ ধরনের সংগ্রামী মানুষ। ফলে ছোট সময়ে স্কুলের দরজায় পা রাখলেও শিক্ষার আলো তার জীবনে পুরোপুরি জ্বলে উঠেনি। বইয়ের পাতা নয়, বরং সংসারের হিসাবই হয়ে উঠেছিল তার প্রথম পাঠ। ছোটোবেলার সেই অপূর্ণ শিক্ষার ক্ষত আজও তার জীবনের ভাঁজে ভাঁজে লেগে আছে।
কিশোরী বয়সে ঢাকায় আসাটাও তার জন্য ছিল বাধ্যতার গল্প। অভাবের তাড়নায় বড় বোনের হাত ধরে শহরে পা রাখেন তিনি। ছোট্ট বাসা, মানুষের ভিড় আর সীমাহীন অনিশ্চয়তার মধ্যে শুরু হয় নতুন লড়াই। এরইমধ্যে গাঁটছড়াও বাঁধেন। কিন্তু জীবনের লড়াই তখন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ভালো জীবনের আশায় স্বামী বিদেশে পাড়ি জমান। ভাগ্য সহায় হয়নি– দুর্ঘটনায় অসুস্থ হয়ে ফিরে আসেন তিনি। আর তখনই পুরো সংসারের ভার এসে পড়ে শাবনূরের কাঁধে।
শাবনূর বলেন, সবশেষ ২০২০ সালে আমি এই গার্মেন্টসে (হপ লুন) যোগ দেই। এটিই আমার জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। হেলপার হিসেবে শুরু করেছিলাম, এখন আমি মেশিন অপারেটর। আমার বেতন শুরু হয়েছিল ৯ হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে, এখন বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার।
সংখ্যাটা শুনতে বড় মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। বাড়িভাড়া, খাবার, সন্তানের পড়াশোনা– সব মিলিয়ে এই আয় যেন মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়। তবুও অন্ধকারের মাঝেও জ্বলে ওঠে আশার আলো।
তিনি বলেন, সম্প্রতি আমি আবার পড়াশোনা শুরু করেছি। সপ্তাহে দুই দিন, দুই ঘণ্টা করে (সকাল ১০টা থেকে ১২টা) কর্মস্থলেই ক্লাস করি। বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক– সবকিছুই আমার কাছে নতুন এক জগতের দরজা খুলে দিচ্ছে। অঙ্ক একটু কঠিন লাগে, কিন্তু যখন বুঝতে পারি, তখন খুব ভালো লাগে।
শাবনূর জানান, তার ৮ বছরের ছোট্ট মেয়েটি– হাবিবা আক্তার ইতি– তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। ইতি স্কুলে পড়ে এবং ছবি আঁকতে খুব ভালোবাসে। ছোট্ট হাতে আঁকে বাড়ি, গাছ, গ্রামের দৃশ্য। তার স্বপ্ন একজন চিত্রশিল্পী হওয়া।
মা হিসেবে শাবনূরের একটাই চাওয়া– মেয়েটি যেন তার মতো অপূর্ণ না থাকে, বরং বইয়ের পাতায় নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই লিখতে পারে।
দিন শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফেরার পরও থেমে থাকেন না তিনি। মেয়ের পাশে বসে আবার বই হাতে নেন। কখনো মেয়ে শেখায়, কখনো তিনি চেষ্টা করেন নতুন অক্ষরগুলো বুঝতে। স্বামীও পাশে থাকেন, অজানা শব্দগুলো বুঝিয়ে দেন।
তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা পাই যখন আমার মেয়ে বলে– ‘আম্মু, আমার সাথে পড়তে বসো’। তখন সব ক্লান্তি ভুলে যাই। মা-মেয়ে একসাথে পড়ার সেই সময়গুলোই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।
নিজের জন্য তেমন কোনো চাওয়া নেই জানিয়ে শাবনূর বলেন, ছোটোবেলা থেকেই আমার মেয়ের রং আর ক্যানভাসের প্রতি আলাদা টান। আমি চাই, সে একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী হয়ে উঠুক। সেই স্বপ্ন পূরণে আমি নিজের সাধ্যের মধ্যে সব ধরনের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমি থামিনি, তাই চাই আমার মেয়েও থেমে না থাকুক। শুধু শিল্পী হওয়াই নয়, আমি চাই সে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করুক।
এই পথচলায় তার কর্মস্থল ‘হপ লুন অ্যাপারেলস লিমিটেড’ পাশে থাকবে–এমনটাই প্রত্যাশা তার।
এদিকে কাজের পাশাপাশি শ্রমিকদের শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সার্বিক উন্নয়নে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কে হপ লুন অ্যাপারেলস লিমিটেডের কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ২০ হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছেন, যার প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। এই বিশাল কর্মীবাহিনীর দক্ষতা ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ‘SheCAN’ (শি ক্যান) প্রোগ্রাম চালু করা হয়।
এটি একটি সমন্বিত উদ্যোগ, যার লক্ষ্য কর্মীদের সার্বিক কল্যাণ ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এই প্রোগ্রামের আওতায় ২০ হাজারের বেশি কর্মী উপকৃত হচ্ছেন। এর মাধ্যমে কর্মীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা, উন্মুক্ত যোগাযোগ নিশ্চিত করা, উন্নয়নের সমান সুযোগ সৃষ্টি করা এবং কর্মীদের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং নারী-পুরুষের মধ্যে জেন্ডার সচেতনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন আধুনিক ও অংশগ্রহণমূলক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। ক্লাসরুম প্রশিক্ষণের পাশাপাশি হ্যান্ডআউট, ফ্লিপ বুক, ট্রেকার শিট, ফিডব্যাক ও মূল্যায়ন, পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন, ভিডিও শেয়ারিং, টিমওয়ার্ক, রোল প্লে এবং গল্প বলার মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া আউটরিচ কার্যক্রম, ফ্লোর ফলো-আপ এবং ব্যবস্থাপনার সঙ্গে শেয়ারিং মিটিংয়ের মাধ্যমেও কর্মীদের সম্পৃক্ত রাখা হয়। ছয়টি কোর মডিউলের মাধ্যমে প্রতিটি ব্যাচে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যা পিয়ার এডুকেটরদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
কারখানাভিত্তিক এই শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে ট্যালেনট্র্যাকের লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি পোশাক শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ বিকাশে কাজ করে আসছে।
এ বিষয়ে ট্যালেনট্র্যাকের লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ট্যালেনট্র্যাকের লিমিটেড দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ বিকাশে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবসময় বাস্তবভিত্তিক ও প্রভাবশালী উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। হপ লুন (বাংলাদেশ) লিমিটেডের সঙ্গে এই শিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা কর্মীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতা উন্নয়নে একটি সুসংগঠিত ও ফলপ্রসূ মডেল বাস্তবায়ন করছি।
তিনি আরও বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, এই উদ্যোগ তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, কর্মদক্ষতা উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পেশাগত যোগ্যতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এমন উদ্যোগের বিষয়ে হপ লুন অ্যাপারেলস লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে অনেক পোশাক শ্রমিকরা (বিশেষ করে নারী কর্মীরা) পড়াশোনার সুযোগ পান না। এ বাস্তবতা থেকে কাজের ফাঁকে সহজ ও নমনীয়ভাবে শেখার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, যাতে তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। এর ফলে নারী কর্মীদের দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও সক্ষমতা বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে তারা নেতৃত্বের ভূমিকায় এগিয়ে যেতে পারবে। এ উদ্যোগের আওতায় মৌলিক শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও সচেতনতা বিষয়ক সেশন পরিচালিত হচ্ছে, যা কর্মীদের জ্ঞান, যোগাযোগ দক্ষতা ও কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে তাদের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
এছাড়া টেকসই ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের ক্ষেত্রে হপ লুনকে অন্যদের থেকে আলাদা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি টেকসই উন্নয়ন ও কর্মীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। সব ধরনের কমপ্লায়েন্স মান কঠোরভাবে অনুসরণ করার পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে একটি যত্নশীল ও দায়িত্বশীল কর্মসংস্কৃতি গড়ে তুলে কর্মীদের কল্যাণ, নিরাপদ অবকাঠামো ও ধারাবাহিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা হচ্ছে। যার ফলে কর্মপরিবেশটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর, টেকসই ও কর্মীবান্ধব হয়ে উঠেছে।
আরএইচটি/জেডএস
