বিজ্ঞাপন

যার কাঁধে সচল অর্থনীতি, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার সেই নারী

যার কাঁধে সচল অর্থনীতি, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার সেই নারী

বাংলাদেশে নারী শ্রমিকদের কাঁধে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে অর্থনীতির চাকা। তৈরি পোশাক খাত থেকে শুরু করে কৃষি, চা–বাগান, গৃহকর্ম, নির্মাণ, হোটেল-রেস্তোরাঁ, আইটি এবং সেবা খাতেও নারীরা অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। তবে তথ্য ও পরিসংখ্যান বলছে, কর্মক্ষেত্রে নানাবিধ বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন এই নারীরাই। নিপীড়ন, যৌন হয়রানি, নিরাপত্তার অভাব, মজুরি বৈষম্য, মাতৃত্বকালীন সুবিধাবঞ্চনা এবং সামাজিক মর্যাদার অভাব নারী শ্রমিকদের ঘিরে রেখেছে এক অদৃশ্য দেয়ালে।

নারী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য শুধু লিঙ্গভিত্তিক নয়, এটি শ্রেণি, কাঠামো এবং মানসিকতার প্রতিফলন। রাষ্ট্রীয় নীতি, শ্রমবাজার এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে এই বৈষম্য বিদ্যমান। গার্মেন্টস খাত থেকে চাকরি হারিয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্র ইটভাটায় কাজ নেওয়া নারী শ্রমিক আয়েশা আক্তারের কথায় এই বৈষম্য ও বঞ্চনার চিত্র ফুটে ওঠে।

আয়েশা জানান, রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকার প্যারিস রোডের একটি গার্মেন্টসে বেতন ভাতা বকেয়া ও নতুন মজুরি কাঠামোয় বেতন পরিশোধ করার দাবিতে আন্দোলনে নামার পর চাকরি হারান তিনি। দুই কন্যার জননী আয়শা আর গার্মেন্টসের কাজে ফিরতে পারেননি। এখন তিনি আমিন বাজারের একটি ইটভাটায় দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন। কাজ করলেই শুধু মজুরি পান।

ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, ‘গার্মেন্টসে বারবার শ্রমিক অসন্তোষ, কাজ বন্ধ, বেতন বকেয়া এবং বাচ্চা নিয়ে কাজ করার নিরাপদ পরিবেশ না থাকায় বাধ্য হয়েই কাজ ছেড়ে দিয়েছি। এখানে অনেক কিছুই নেই, তবে মন চাইলে কাজ করি, মন চাইলে করি না।’ আয়েশার মতো আরও কয়েক শ শ্রমিক ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মধ্যে মিরপুর ১০ এলাকার মনোয়ারা, খান ও এনায়েত গার্মেন্টসে চাকরি হারান। মালিকপক্ষ সাব-কন্ট্রাক্টভুক্ত ও লোকাল গার্মেন্টস হওয়ায় নতুন মজুরি কাঠামোয় বেতন দিতে অক্ষমতা প্রকাশ করেছিল।

অটোমেশন ও মজুরি-সুবিধার অভাবে তৈরি পোশাক খাতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা যে কমছে তা উঠে এসেছে বিজিএমইএ’র ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসের এক প্রতিবেদনে। সেখানে দেখা যায়, ১৯৮০ সালে নারী শ্রমিকের হার ছিল ৮০ শতাংশ, যা ২০২১ সালে কমে ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির এমআইবি প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৩০ মার্চ পর্যন্ত যুক্ত হওয়া ৩,৭২৩টি কারখানার ৫৮ শতাংশ নারী এবং ৪২ শতাংশ পুরুষ। অথচ নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে পোশাক খাতের মোট শ্রমিকের ৮০ শতাংশের বেশি ছিলেন নারী। বিশেষ করে যারা গ্রামাঞ্চল থেকে রাজধানীতে এসে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করতেন তারা এই খাতে কাজ নিতেন।

অটোমেশন, স্বয়ংক্রিয় মেশিনের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং নারীবান্ধব পরিবেশের অভাবে তৈরি পোশাক খাতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। ১৯৮০ সালে এই খাতে ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিক থাকলেও ২০২১ সালে তা কমে ৫৩.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। নারীরা নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পাচ্ছেন না

শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর পরিচালক (প্রোগ্রাম অ্যান্ড ইনফরমেশন) কোহিনুর মাহমুদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, গার্মেন্টসে কাজের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ ও আগ্রহ ক্রমশ কমছে। এর পেছনের কারণগুলো হলো— কারখানাগুলোতে স্বয়ংক্রিয় মেশিনের ব্যবহার বাড়ায় নারীরা পিছিয়ে পড়ছেন। অনুন্নত কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তাহীনতা, মজুরি বৈষম্য, নিপীড়ন এবং যৌন হয়রানির ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়া পাশাপাশি সন্তান লালন-পালনের অসুবিধা, পারিবারিক দায়বদ্ধতা, বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং স্বামীর আয়ের উৎস বৃদ্ধি নারীদের কাজ ছেড়ে দেওয়ার অন্যতম কারণ। অটোমেশন বা প্রযুক্তির ব্যবহার যদি নারীদের পিছিয়ে পড়ার কারণ হয়, তবে অনুন্নত কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তাহীনতা এবং পারিবারিক দায়িত্বের চাপ— এই সবগুলো মিলেই তৈরি পোশাক খাতে নারীদের অবস্থানকে দিনদিন সংকুচিত করে দিচ্ছে।

বিভিন্ন সংস্থা ও জরিপে বৈষম্যের করুণ চিত্র 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ এবং বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের আলোকে বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের বর্তমান অবস্থা এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের বৈষম্যের চিত্র অত্যন্ত করুণভাবে ফুটে উঠেছে। এই তথ্যগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নারীদের যে অদম্য ভূমিকা, তার আড়ালে থাকা বঞ্চনা এবং নিরাপত্তাহীনতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

বিবিএস-এর ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৪.২ শতাংশ নারী, যা ২০১৭ সালে ছিল মাত্র ৩৬ শতাংশ। এই বিশাল সংখ্যক নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক। তবে বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, এই ৪৪.২ শতাংশ নারীর মধ্যে প্রায় ৯৬.৬ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। এর অর্থ হলো, এই বিপুলসংখ্যক নারী কৃষি, গৃহকর্ম, চা-বাগান, গৃহকেন্দ্রিক কাজ, দোকান বা ছোট উৎপাদন ইউনিটে কাজ করেন, যেগুলি শ্রম আইন বা সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আসেনি। তারা চাকরির স্থায়িত্ব, পেনশন বা অন্যান্য সুবিধাদি থেকে বঞ্চিত হন এবং তাদের অধিকারও অনির্দিষ্ট থাকে।

 

গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও কৃষিজমির মালিকানায় নারীর অংশ মাত্র ১২ শতাংশ (বিবিএস, ২০২৩)। নারী কৃষি শ্রমিকেরা সাধারণত মৌসুমি বা দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন এবং তাদের মজুরি পুরুষের তুলনায় গড়ে ৩০ শতাংশ কম। অনেক সময় নারীর কাজকে ‘সহায়তাকারী শ্রম’ বা গৃহস্থালির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, ফলে তাদের কাজের কোনো আর্থিক মূল্য নির্ধারিত হয় না এবং তারা তাদের শ্রমের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।

বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটি’র মাঠ জরিপ অনুযায়ী, গার্মেন্টস খাতে নারী কর্মীদের পদোন্নতি বঞ্চনা প্রকট। ৭৩ শতাংশ নারী কর্মী কখনও পদোন্নতি পাননি এবং ৬৮ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, মাতৃত্বকালীন ছুটি নিলে তাদের চাকরি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটি’র নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত এক দশকে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও কাজের মান ও মর্যাদা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অর্থনীতিতে নারীর বিশাল অবদান থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের মজুরি, কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে নারী শ্রমিকরা এখনও অনিরাপদ ও অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কাজ করছেন এবং প্রতিনিয়ত অবমূল্যায়িত হচ্ছেন।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, কৃষি ও সেবা খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা অর্থনীতির চাকা সচল রাখলেও কর্মক্ষেত্রে নানাবিধ বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। নিপীড়ন, যৌন হয়রানি, নিরাপত্তার অভাব, মজুরি বৈষম্য এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধাবঞ্চনা নারী শ্রমিকদের অধিকার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা তাদের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে

আইএলও-২০২৩ এর তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি খাতভিত্তিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশই আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে, যেখানে প্রায় ৪০ লাখ নারী কাজ করেন। অথচ একই কাজের জন্য পুরুষের তুলনায় নারীরা গড়ে ২১ শতাংশ কম মজুরি পান।

নারী শ্রমিকদের অন্যান্য সুবিধা বঞ্চনা সম্পর্কে কল্পনা আক্তার বলেন, ডে-কেয়ার সেন্টার ও মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো মৌলিক সুবিধাগুলো ৫ থেকে ১০ শতাংশ কারখানাতেও নেই। ফলে ৫-৭ বছর কাজ করার পর কোনো নারী যখন সন্তান নেওয়ার কথা ভাবেন, তখন তিনি আর কাজ চালিয়ে যাওয়ার সাহস পান না। কারণ, বাচ্চা নিয়ে কাজ করার মতো অনুকূল পরিবেশ তিনি পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে জমানো টাকাটুকু নিয়ে তিনি গ্রামে ফিরে যান এবং মূলত চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই পড়েন।

বাংলাদেশে প্রায় ২০ লাখ নারী গৃহকর্মীর কাজ করেন–উল্লেখ করে কল্পনা আক্তার বলেন, এই খাতে কোনো লিখিত চুক্তি নেই, কাজের নির্ধারিত সময় নেই, ন্যায্য ছুটি নেই এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে মজুরিও নির্ধারণ করা হয় না। শহরের বেসরকারি গৃহকর্মীদের মাসিক গড় আয় মাত্র সাত হাজার টাকা, যা জাতীয় ন্যূনতম মজুরির অর্ধেকও নয়।

চা-বাগান ও কৃষিশিল্পে জড়িত নারী শ্রমিকদের অবস্থা আরও নাজুক বলে তিনি মন্তব্য করেন। চা-বাগান শ্রমিকদের মধ্যে ৭০ শতাংশই নারী, কিন্তু তারা দিনে মাত্র ১৭০ থেকে ১৮৫ টাকা মজুরি পান। এখানকার নারী শ্রমিকদের অনেকেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক গতিশীলতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। দিনে আট ঘণ্টা কাজ করলেও চা-বাগানের নারী শ্রমিকদের জন্য স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। অথচ প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাদের এই সীমাবদ্ধ জীবনই যাপন করতে হচ্ছে, যা শুধু শ্রম অধিকারেরই নয়, মানবাধিকারেরও চরম লঙ্ঘন।

নির্মাণ-সেবাখাতে নিরাপত্তা সরঞ্জাম পান না ৬০ শতাংশ নারী শ্রমিক

আইএলও ও বিজিএমইএ’র ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্মাণশিল্পে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়লেও তাদের নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে, নির্মাণ সাইটে কাজ করা নারী শ্রমিকদের ৬০ শতাংশই কোনো ধরনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সরঞ্জাম পান না। অন্যদিকে, সেবা খাত যেমন– হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বিউটি পার্লারে দীর্ঘ সময় কাজ করলেও নারীদের শ্রমের মূল্য ও অধিকার উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে। মূলত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কারণে তাদের চাকরি, বেতন এবং অন্যান্য আইনগত অধিকার অনির্দিষ্ট থাকে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত হওয়ায় এসব কর্মক্ষেত্র রাষ্ট্রীয় নীতি ও নজরদারির বাইরেই থেকে গেছে, ফলে বঞ্চনার হার এখানে সবচেয়ে বেশি।

সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি’র নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাংলাদেশের শ্রম আইনে ‘সমান কাজের জন্য সমান মজুরি’র নীতি থাকলেও বাস্তবে তা বহুলাংশেই উপেক্ষিত। গার্মেন্টস খাতে মজুরি বৈষম্য তুলনামূলক কম হলেও পদোন্নতির ক্ষেত্রে নারীরা চরম বঞ্চনার শিকার। মাঝারি পদ থেকে শুরু করে নিচের সারিতে কর্মরত নারীরা বছরের পর বছর একই পদে থেকে যান। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, দেশের শ্রমিক ইউনিয়ন ও ফেডারেশনগুলোর নেতৃত্বস্থানীয় পদে নারীর উপস্থিতি মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ। ফলে শ্রমনীতি নির্ধারণ বা অধিকার আদায়ের দর-কষাকষিতে নারীদের দাবিগুলো জোরালোভাবে উপস্থাপিত হয় না।

বাংলাদেশের শ্রম আইনে নারীদের অধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ খুবই দুর্বল। মোট নারী শ্রমিকের প্রায় ৯৬.৬ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত, যা শ্রম আইন বা সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আসেনি। এছাড়া চা-বাগান, গৃহকর্মী ও নির্মাণ শ্রমিকরা নূন্যতম মজুরি ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন

আইন ও প্রয়োগের ব্যবধানেও বৈষম্যের শিকার নারী

বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী, নারী শ্রমিকদের জন্য সমান সুযোগ ও সমান মজুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হলে বাংলাদেশের জিডিপি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার মনে করেন, নারী শ্রমিকদের প্রতি বৈষম্য শুধু ন্যায্যতার প্রশ্ন নয়, এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও একটি বড় বিষয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও বৈষম্যহীনতার নিশ্চয়তা দিলেও বাস্তবে এগুলো বাস্তবায়নে প্রকট ঘাটতি রয়েছে। নারী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইএলও কনভেনশন ১০০ (সমান মজুরি), ১১১ (বৈষম্য নিষিদ্ধকরণ) এবং ১৯০ (সহিংসতা প্রতিরোধ সংক্রান্ত)— এগুলো এখনও অনুস্বাক্ষর করা হয়নি। এছাড়া, শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থাও দুর্বল। আইএলও-র ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ৭০ হাজার শ্রমিকের জন্য মাত্র একজন পরিদর্শক রয়েছেন, যার ফলে অধিকাংশ বৈষম্যই অনিরীক্ষিত থেকে যায়।

আইনে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত অন্তর্ভুক্ত না করা হতাশার

বাংলাদেশে মোট নারী শ্রমিকের প্রায় ৮০ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও সরকার নতুন আইনে এই খাতকে অন্তর্ভুক্ত না করায় হতাশা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার। তিনি বলেন, আশা করা হয়েছিল নতুন আইনে সরকার এটিকে স্বীকৃতি দেবে, কিন্তু তা না হওয়ায় এই বিপুল সংখ্যক শ্রমিক সরকারি হিসাবের বাইরেই রয়ে গেলেন।

তিনি এই খাতকে আইনের আওতায় এনে শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং শ্রম আইন অনুযায়ী মাতৃত্বকালীন ছুটি, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সমান মজুরির বিধান কার্যকরভাবে প্রয়োগের দাবি জানান। এছাড়া, ইউনিয়ন ও নেতৃত্বে নারীর প্রতিনিধিত্ব অন্তত ৪০ শতাংশে উন্নীত করার এবং নারীকে ‘সহায়ক’ নয়, বরং ‘সমান অংশীদার’ হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরির জোর দেন।

অন্যদিকে, পোশাক খাতের নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দীন আহমেদ। এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, কাজের জন্য ৩০ বছরের জন্য শহরে আসা এই নারীদের নিরাপত্তার বিষয়ে সরকার বা শহর কতটুকু প্রস্তুত, তা ভাবা হয়নি। শিল্পাঞ্চলগুলোতে সরকারি হাসপাতাল, শিশুদের জন্য ডে কেয়ার সেন্টার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ন্যায্য মজুরির নিশ্চয়তা নেই, যা শ্রম খাতে সামগ্রিক নিরাপত্তাহীনতাকে ফুটিয়ে তোলে।

একই সভায় বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, শুধু মালিকের পক্ষে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সরকার যদি শিল্প এলাকায় স্বল্পমূল্যে শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করত, তবে মূল মজুরির ওপর চাপ কমত এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা সহজ হতো। তারা এই ন্যায্য মজুরি দিতে চান বলেও জানান।

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক ও মজুরি কাঠামো সম্পর্কে জানতে চাইলে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক উপসচিব (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। তবে, সার্বিকভাবে মজুরি কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে পাঁচ বছর পরপর মজুরি নির্ধারণ এবং প্রতি বছর বেতন বৃদ্ধির নিয়ম ছিল, যা নতুন আইনে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। প্রতি বছর বেতন বৃদ্ধির বিষয়টিও বহাল রাখা হয়েছে।’

জেইউ/এমএআর