রাতের ঢাকা তখনও পুরোপুরি ঘুমিয়ে পড়েনি। মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেন সিটির কাছে বাসে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এক মাদরাসা শিক্ষক। মুহূর্তের মধ্যে কয়েকজন অচেনা লোক তাকে ঘিরে ফেলেন। গালিগালাজ আর হুমকির পর জোরপূর্বক তুলে নেওয়া হয় একটি মাইক্রোবাসে। কোথায় বা কেন নেওয়া হচ্ছে— কিছুই জানা নেই তার। কেবল চোখ বাঁধা, হাতকড়া আর এক অনিশ্চয়তার দীর্ঘ রাত।
এভাবেই শুরু হয় মাদরাসা শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলামের গুমজীবনের ভয়াবহ এক যাত্রা। ৩৮ বছর বয়সী শফিকুল বর্তমানে পূর্বাচলের একটি মাদরাসার প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্বরত। এছাড়া তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর (পল্টন) জোনের সহ-সেক্রেটারি। ২০২২ সালে তিনি গুমের শিকার হন।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও অমানুষিক নির্যাতনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সোমবার (৪ মে) সাক্ষ্য দেন শফিকুল। চার নম্বর সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনাল-১-এ তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
জবানবন্দিতে শফিকুল ইসলাম ২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারির সেই ভয়াবহ রাতের বর্ণনা দিয়ে বলেন, মোহাম্মদপুর থেকে এশার নামাজ পড়ে পূর্বাচলের মাদরাসার উদ্দেশে রওনা হই। জাপান গার্ডেন সিটির কাছে পৌঁছালে রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে রিকশা থেকে নেমে বাসে উঠছিলাম। এ সময় হঠাৎ কিছু লোক আমাকে ঘেরাও করে ফেলেন। একজন আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন। অপর একজন হুমকি দিয়ে বলেন— ‘সোজা গাড়িতে ওঠ, নইলে গুলি করে দেব’। এরপর আমাকে ধাক্কা দিয়ে একটি মাইক্রোবাসে তোলা হয়।’
তিনি বলেন, গাড়িতে তুলেই আমার ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন তারা। পরিচয় জানতে চাইলে উল্টো আমার পরিবারের বিবরণ বলতে থাকেন। একপর্যায়ে নিজেদের প্রশাসনের লোক দাবি করে বলেন— ‘আমাদের অফিসার তোর সঙ্গে দুই-চার ঘণ্টা কথা বলবে, এরপর তোকে মাদরাসায় দিয়ে আসব’। গাড়িটি প্রায় ঘণ্টাখানেক চলার পর একজন তাদের ‘স্যার’কে জিজ্ঞাসা করেন, ‘স্যার চশমা পরিয়ে দেব?’ তিনি সম্মতি দিলে একটি কাপড় দিয়ে খুব শক্ত করে আমার চোখ বেঁধে ফেলা হয়। গাড়ির ভেতরে একজন ফোনে বলেন, ‘মামা নিয়ে আসতেছি, মেহমানদারীর ব্যবস্থা করো’। এরপর আমার দুই হাতে হাতকড়া লাগানো হয়।
গাড়িটি এক জায়গায় গিয়ে থামার পর শফিকুলকে নামিয়ে সোজা হাঁটতে নির্দেশ দেওয়া হয়। কয়েক কদম হাঁটার পর সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে একটি স্টিলের দরজা খোলার শব্দ পান তিনি। ভেতরে নেওয়ার পর হাতকড়া খুলে শরীর তল্লাশি করা হয়।
এই মাদরাসা শিক্ষক ট্রাইব্যুনালকে জানান, তল্লাশির পর তাকে অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত কাপড় পরতে দেওয়া হয়। চোখ বাঁধা অবস্থাতেই সরু পথ দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় হুমকি দেওয়া হয়— ‘যদি চোখ খোলার চেষ্টা করিস, তবে দুচোখ উপড়ে ফেলা হবে’। একপর্যায়ে ছোট একটি প্লেটে সবজি ও মাছ দিয়ে খাবার দেওয়া হয়। নির্দেশ আসে— ‘উল্টা দিকে ফিরে খাবার খেয়ে নে, পেছনের দিকে তাকাবি না’। খাবার শেষে হাত ধোয়া পানিই খেয়ে ফেলতে বলা হয়। এরপর লোহার গ্রিল দেওয়া দরজা লাগিয়ে তারা চলে যান।
শফিকুল জানান, পরদিন সন্ধ্যার সময় একজন লোক তার সেলে আসেন। ২৪ ঘণ্টা পার হলেও কেন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে না জানতে চাইলে কোনো জবাব মেলেনি। তিনি মাদরাসার প্রায় ২০০ ছাত্রের খাবারের দুশ্চিন্তার কথা জানালে দায়িত্বরতরা উপহাস করে বলেন, ‘তোরাতো শহীদ হতে চাস, আর ওই ছাত্রদের খাবারের দায়িত্ব আল্লাহর। ওসব নিয়ে এখন আর টেনশন করে লাভ নেই, নিজের চিন্তা কর।’
জবানবন্দিতে শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, দু-তিনদিন পর তাকে ওই কক্ষ থেকে বের করে গাড়িতে করে আরেকটি ভবনে নেওয়া হয়। শব্দ শুনে বোঝেন তার সঙ্গে আরও একজনকে নেওয়া হয়েছে। ওই ভবনে ঢোকার পর অন্য ব্যক্তিকে আলাদা করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়।
শফিকুলকে একটি ছোট কক্ষে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। হাতকড়া পরা অবস্থাতেই তিনি চোখের কাপড় কিছুটা সরিয়ে কক্ষটি দেখার চেষ্টা করেন। দেখতে পান, কক্ষের মেঝেতে তারের মতো কিছু বসানো, চারদিকে কালো দেওয়াল, ওপরে একটি ওয়াল ফ্যান এবং কোণায় একটি স্টিলের ইলেকট্রিক চেয়ার। এ দৃশ্য দেখে তিনি চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
কিছুক্ষণ পর একজন ব্যক্তি কক্ষে ঢুকে তার চোখের বাঁধন খুলে ছবি তোলেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে একটি চেয়ারে বসানো হয়। সামনে একটি টেবিলে হাত রেখে তাকে কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা স্বীকার করতে চাপ দেওয়া হয়। তিনি এসব বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানালে লাঠি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা শুরু হয়।
তাকে হুমকি দিয়ে বলা হয়, ‘এই চেয়ারে বসিয়ে শায়েখ আব্দুর রহমান ও জসিম উদ্দিন রহমানীকে সার্ফ এক্সেল দিয়ে ধুয়ে তাদের পেট থেকে সব বের করা হয়েছে, তোকে-ও তাই করা হবে।’ আরও বলা হয়, ‘জঙ্গি হিসেবে স্বীকারোক্তি দিবি, নয়তো তোকে কেটে টুকরো টুকরো করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হবে, অথবা এখানে রেখে পাগল বানিয়ে ঢাকায় ছেড়ে দেওয়া হবে। ঢাকার অধিকাংশ পাগল আমাদের তৈরি।’
শফিকুল বলেন, সেখানে এমন এক ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি করা হয় যে মনে হচ্ছিল আমাকে এখনই হত্যা করা হবে। একপর্যায়ে আমি হাউমাউ করে কাঁদতে থাকি। অমানুষিক নির্যাতনের মুখে এক কর্মকর্তার পা জড়িয়ে ধরে বলি, ‘আমার বাচ্চার বয়স মাত্র দুই মাস, তাকে এতিম করবেন না। আমাকে যত খুশি মারুন, কিন্তু একবারে মেরে ফেলবেন না।’
এরপর তাকে আবার চেয়ারে বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। উপস্থিত ব্যক্তিরা একে অপরকে বলতে থাকেন, ‘সে খুব রহস্যজনক, সহজে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি পাওয়া যাবে না।’ একইসঙ্গে তার ঘুম কমিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
শফিকুল ট্রাইব্যুনালকে জানান, যখন তাকে ছোট কক্ষে রাখা হয়েছিল, তখন সঙ্গে আনা অন্য ব্যক্তির ভয়াবহ চিৎকারের শব্দ শুনতে পান, যা তাকে আরও ভীত করে তোলে। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে আবার আগের দুর্গন্ধযুক্ত কক্ষে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে বসা বা শোয়ার সুযোগ ছিল না, ঘুমানোরও অনুমতি ছিল না। বেশিরভাগ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। বলা হতো, ঘুমাতে দেখা গেলে পেছনে হাতকড়া লাগিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হবে। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে মেরুদণ্ডে তীব্র ব্যথা এবং ঘুমের অভাবে চোখে অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করতেন তিনি। শক্ত করে চোখ বেঁধে রাখায় মাথাব্যথাও বেড়ে যায়। এভাবে প্রায় এক সপ্তাহ চলার পর তাকে আবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আগের স্থানে নেওয়া হতো এবং নির্যাতন শেষে কক্ষে ফিরিয়ে আনা হতো।
তিনি গুমজীবনের আরও কষ্টের বর্ণনা দিয়ে জানান, এক দিন ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য মাত্র তিন মিনিট সময় দেওয়া হয়। বাথরুমের দরজা আংশিক খোলা রাখা হতো এবং বাইরে একজন প্রহরী দাঁড়িয়ে থাকতো। দাঁত পরিষ্কারের কোনো ব্যবস্থা ছিল না, গোসলের সময় হঠাৎ ভেতরে ঢুকে মারধর করা হতো।
সেলে থাকা অবস্থায় অন্য বন্দিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টার কথা জানিয়ে শফিকুল বলেন, ‘এক দিন আমার সেলের দরজায় ছোট প্লাস্টারের টুকরা এসে পড়ে। চোখের কাপড় কিছুটা সরিয়ে দেখতে পাই, বিপরীত সেলে আরেকজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন। চোখ বাঁধা ও হাতে হাতকড়া থাকা ওই ব্যক্তির সঙ্গে ইশারার মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করি। দেওয়াল আঙুল দিয়ে অক্ষর লেখার মতো করে তিনি নিজের নাম জানান মেহেদী হাসান ডলার, বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ায়। পাশের আরেকটি সেলে থাকা আরেক বন্দির পরিচয়ও একই কৌশলে জানতে পারি। তার নাম সোহেল রানা, বাড়ি শেরপুরের ঝিনাইগাতিতে।’
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমল সংঘটিত এই গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট আসামি ১৭ জন। এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকা সেনানিবাসের সাব-জেলে আছেন সাবেক ও বর্তমান ১০ সেনা কর্মকর্তা। বাকি আসামিরা এখনও পলাতক। তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা আইনি লড়াই করছেন।
এমআরআর/এমএআর/
