চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের তেমুহানী মৌজায় প্রায় ১০০ একর বিস্তীর্ণ কৃষিজমির চারপাশে কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ধরে মাটি বাণিজ্য চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে একদিকে যেমন উর্বর কৃষিজমি ডোবা ও জলাশয়ে পরিণত হচ্ছে, অন্যদিকে মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় জমির মালিক ও কৃষকরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেশ কয়েক বছর আগে সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য বাবর আহমদ বাবু জমির মালিকদের নিয়মিত খাজনা পরিশোধের শর্তে মৎস্য প্রকল্প (ফিশারি) করার কথা বলে ওই কৃত্রিম বাঁধটি নির্মাণ করেন। তবে, মাছ চাষের পরিবর্তে তার নেতৃত্বাধীন একটি সিন্ডিকেট রাতের আঁধারে এক্সক্যাভেটর (মাটি কাটার যন্ত্র) দিয়ে মাটি কেটে ডাম্প ট্রাকযোগে বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহ করতে শুরু করে। ফলে একসময়ের তিন ফসলি কৃষিজমি এখন বিশাল জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমেও ওই কৃত্রিম বাঁধের ভেতর থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় সরবরাহের পরিকল্পনা করেছিল সিন্ডিকেটটি। তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশের ব্যাপক তৎপরতার কারণে তা ভেস্তে যায়। বর্তমানে মাঝেমধ্যে রাতের আঁধারে মাটি কাটার চেষ্টা করা হলেও পুলিশ অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি এক্সক্যাভেটর জব্দ করেছে। এছাড়া, এই এলাকার অন্যান্য কৃষিজমি থেকেও কৃষকদের অজান্তে রাতের আঁধারে মাটি লুটের অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ কৃষিজমির চারপাশে এক্সক্যাভেটরের সাহায্যে বড় কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ করায় সেখানে কৃষিকাজ ও ফসল উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। বাঁধের ভেতর থেকে মাটি কেটে নেওয়ায় জমিগুলো অসমান হয়ে পড়ে আছে। লোকদেখানো হিসেবে বন্যা ও পাহাড়ি ঢল থেকে বাঁধটি রক্ষায় কিছু গাছও লাগানো হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযুক্ত বাবর আহমদ বাবু কালিয়াইশ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের রসুলাবাদ গ্রামের মৃত গুরা মিয়া সওদাগরের ছেলে। অতীতে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারেও গিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। এর আগে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ‘সাতকানিয়া ব্রিকফিল্ড মালিক কল্যাণ সমবায় সমিতি’ তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। ওই অভিযোগে বাবুর বিরুদ্ধে নতুন ইটভাটা স্থাপন ও মাটি কাটার জন্য জমির মালিকদের অনুমতি ছাড়াই জোরপূর্বক ১০০ একর কৃষিজমিতে বেড়িবাঁধ নির্মাণের অভিযোগ এনে আইনি প্রক্রিয়ায় জমি উদ্ধারের দাবি জানানো হয়।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে আবদুল মুনাফ নামের এক ব্যক্তি সাতকানিয়ায় কৃষিজমির মাটি কাটার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। ওই রিটে বাবর আহমদ বাবুকে ৭ নম্বর বিবাদী করা হয়। রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেন এবং বাবুর মালিকানাধীন ‘বিডিআর ব্রিকস’ নামক ইটভাটার মাটি কাটার কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দেন। এই আদেশের পরও মাটি কাটা অব্যাহত থাকায় বিষয়টি পুনরায় আদালতের নজরে আনা হলে হাইকোর্ট তৎকালীন জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার (এসপি), সাতকানিয়ার ইউএনও এবং ওসিকে ভার্চুয়ালি আদালতে হাজির হওয়ার তলব করেন। পরবর্তীতে আদালত পুরো ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন এবং ৩০ দিনের মধ্যে বাইরে থেকে পলিমাটি এনে খননকৃত কৃষিজমিগুলো ভরাট করার নির্দেশনা প্রদান করেন।
ভুক্তভোগী সাতকানিয়া পৌরসভার বাসিন্দা সরওয়ার হোসেন বলেন, ‘তেমুহানী মৌজায় আমার মায়ের প্রাপ্য জমি থেকে বাবর আহমদ বাবু ও তার সহযোগীরা রাতের আঁধারে প্রায় ৩৫ লাখ টাকার মাটি লুট করে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে জমির দাম বা টাকা পরিশোধ না করে তারা আমাকে উল্টো বেধড়ক মারধর করে এবং চাঁদা দাবি করে। এ ঘটনায় আমি বাদী হয়ে সাতকানিয়া থানায় এজাহার দায়ের করলেও বিষয়টি এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।’
মোহাম্মদ সাকিব নিবিল নামে স্থানীয় এক ইটভাটার ম্যানেজার বলেন, ‘বাবর আহমদ বাবুসহ বেশ কয়েকজন অস্ত্রধারী আমাদের ইটভাটায় প্রবেশ করে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এর পরের দিন রাতে তারা পুনরায় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এসে ইটভাটায় হামলা চালায়। নৈশপ্রহরী মাহাবুবুল আলম বাধা দিলে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। তার চিৎকার শুনে আমি এগিয়ে গেলে বাবু আমাকে লক্ষ্য করে গুলি করেন, যা আমার মাথায় আঘাত করে। এ ঘটনায় আমি বাদী হয়ে চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেছি।’

সাতকানিয়া ব্রিকফিল্ড মালিক কল্যাণ সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরিদুল আলম বলেন, ‘বাবর আহমদ বাবু ব্যক্তিগত উদ্যোগে ওই কৃত্রিম বাঁধটি নির্মাণ করেছিলেন। বর্তমানে সেখানকার সর্বশেষ অবস্থা আমার জানা নেই। তবে, জমির মালিক ও কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি হয়— এমন যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে বাবর আহমদ বাবুর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। তার ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারাও বর্তমানে বাবুর অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেননি।
এ বিষয়ে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বিষয়টি যেহেতু আদালতে বিচারাধীন, তাই এটা নিয়ে এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। তবে, বর্তমানে মাটি কাটার অভিযোগগুলো সত্য নয়। আমরা সাতকানিয়ার কোনো এলাকাতেই অবৈধভাবে মাটি কাটতে দিচ্ছি না।’
সাতকানিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত বাবর আহমদ বাবুকে শিগগিরই গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।’
আতিকুল হা-মীম/এমএআর/
