দেশে বর্তমানে প্রায় ২৪.৫ কোটি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে মাসিক লেনদেনের পরিমাণ ১.৫ ট্রিলিয়ন টাকারও বেশি। অন্যদিকে দেশে মোবাইল ইন্টারনেটের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হলেও এখনো ব্যবহারগত বৈষম্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ডিভাইসের উচ্চ মূল্য, ডিজিটাল দক্ষতার অভাব, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও প্রাসঙ্গিক কনটেন্টের সীমাবদ্ধতা এখনো ইন্টারনেট ব্যবহারের বড় প্রতিবন্ধকতা।
রোববার (১৭ মে) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) ভবনে বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল— ‘ডিজিটাল জীবনধারা : সংযোগে স্থিতি, সহনশীলতায় শক্তি’।
সেমিনারে বিটিআরসির স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আমিনুল হক বলেন, ডিজিটাল সংযোগ এখন শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধা নয়, বরং অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য অপরিহার্য জীবনরেখায় পরিণত হয়েছে। সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সমাজ গড়ে তুলতে নির্ভরযোগ্য কানেক্টিভিটি ও নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেমিনারে ‘কানেক্টিভিটি অ্যাজ দ্য লাইফলাইন অব আ রেজিলিয়েন্ট ডিজিটাল ইকোনমি’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জেডটিই করপোরেশন বাংলাদেশ লিমিটেডের ডেপুটি চিফ টেকনিক্যাল অফিসার সৈয়দ মো. সামশুর রহমান। ‘ডিজিটাল পেমেন্টস অ্যাজ ক্রিটিক্যাল রেইলস অব ইকোনমিক কনটিনিউটি’ বিষয়ে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বিকাশের চিফ এক্সটার্নাল অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার মেজর জেনারেল (অব.) শেখ মো. মনিরুল ইসলাম। এছাড়া ‘ফ্রম অ্যাকসেস টু ইমপ্যাক্ট : ডেলিভারিং মিনিংফুল ডিজিটাল সার্ভিসেস ফর ইনক্লুসিভ গ্রোথ’ শীর্ষক উপস্থাপনা করেন গ্রামীণফোনের চিফ বিজনেস অফিসার ড. আসিফ নাইমুর রশিদ।
পরে বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের কমিশনার মাহমুদ হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন বিডিজবস ডটকমের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এ কে এম ফাহিম মাশরুর, রবি আজিয়াটা লিমিটেডের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম, ইন্টারক্লাউড লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসিবুর রশিদ এবং শিক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শিখোর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও শাহীর চৌধুরী।
প্যানেল আলোচনায় বক্তারা বলেন, বর্তমান বিশ্বের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক লেনদেন ও নাগরিক সেবার প্রতিটি ক্ষেত্র এখন ডিজিটাল সংযোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। তাই স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সাশ্রয়ী ইন্টারনেট, মানসম্মত টেলিযোগাযোগ সেবা, নিরাপদ ডাটা অবকাঠামো এবং সহজলভ্য স্মার্ট ডিভাইস নিশ্চিত করা জরুরি।
বক্তারা বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতে সেবার মান উন্নয়নের সঙ্গে বিনিয়োগের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। গ্রাহকদের মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে অব্যাহত বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডাটা ও স্মার্টফোনের উচ্চমূল্য ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সেবার ওপর বিদ্যমান কর ও শুল্ক যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা গেলে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী ডিজিটাল সেবার আওতায় আসবে এবং শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলেও মত দেন তারা।
আলোচকরা আরও বলেন, দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে। তাদের প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ভিত্তিক অর্থনীতির যুগে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা বলেন, ডাটা ও ডিভাইস মানুষের হাতে পৌঁছে দিলে সাধারণ মানুষ নিজেরাই প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠবে। তাই ডিজিটাল সেবায় প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা কমিয়ে আরও বেশি মানুষের হাতে স্মার্টফোন ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে হবে।
বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান মো. আবু বকর ছিদ্দিক বলেন, টেলিকম রেগুলেটরকে সব পক্ষের অবস্থান ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হয়। সরকার, শিল্পখাত ও জনগণের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করে টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল খাতের উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়াই বিটিআরসির অন্যতম দায়িত্ব। নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ডিজিটালনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস-২০২৬ উদযাপনের অংশ হিসেবে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এছাড়া দিবসটি উপলক্ষ্যে ১৭ ও ১৮ মে দুই দিনব্যাপী বিটিআরসি প্রাঙ্গণে আয়োজিত টেলিকম মেলায় মোবাইল অপারেটর, মোবাইল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, টাওয়ার কোম্পানি, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার, আইসিএক্স অ্যাসোসিয়েশন, ব্যাংক, রোবোলাইভসহ টেলিকম ও প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট ৩০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। মেলায় টেলিকম খাতসংশ্লিষ্ট দর্শনার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন এবং বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আগত দর্শনার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়। মেলা চলবে ১৮ মে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত।
এমএইচএন/এমএন
