প্রস্তাবিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬’-এর খসড়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে কমিশনকে সরকার ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল রাখার বিধান এবং কমিশনার নিয়োগে সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার উদ্যোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
মঙ্গলবার (১৯ মে) এক সংবাদ বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারিকৃত অধ্যাদেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গুম-খুনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ঘটনার সরাসরি তদন্ত, শাস্তির পরিমাণ, দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের শাস্তির সুপারিশ প্রদানে কমিশনকে যে এখতিয়ার প্রদান করা হয়েছিল, নতুন খসড়া আইনে সেখানে ২০০৯ সালের আইনের ১৮-ধারা হুবহু প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী আমলের চর্চাকে অব্যাহত রাখার বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনকে পুনরায় সরকার বা বাহিনী প্রধানের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে।’
প্রস্তাবিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬’-এর খসড়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। তাদের মতে, নতুন আইনে ২০০৯ সালের বিতর্কিত ধারা বহাল রেখে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তে কমিশনকে পুনরায় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা মূলত অভিযুক্তদের সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে
তিনি আরও বলেন, ২০০৯ সালের আইনের এই ধরনের দুর্বলতার কারণেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কখনোই ‘এ’ ক্যাটাগরির স্ট্যাটাস দেওয়া হয়নি। তদুপরি, বিগত সময়ে গুম-খুনসহ মানবাধিকার হরণের যত ঘটনা ঘটেছে, তার অধিকাংশ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে এই বিধানটি বহাল রাখা হলে, তা মূলত তাদের সুরক্ষা হিসেবে কাজ করবে।
খসড়া আইনের ১৩-ধারার উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘মানবাধিকার কমিশনকে স্বপ্রণোদিতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না, তা তদন্ত করার এখতিয়ার দেওয়া হয়নি। এছাড়া, গোয়েন্দা সংস্থা ও সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য আটকস্থল, যেখানে গুমসহ বিভিন্ন নির্যাতনের জন্য আটককৃত ব্যক্তিদের রাখার সম্ভাবনা রয়েছে, এমন স্থানসমূহ অনুসন্ধান, পরিদর্শন ও তদন্ত করা এবং এইরূপ স্থান ও অবস্থার উন্নয়নের জন্য সরকারের নিকট প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদানের যে সুযোগ অধ্যাদেশে রাখা হয়েছিল, তাও খসড়ায় রহিত করা হয়েছে।’
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কমিশনার নিয়োগের বাছাই কমিটির সদস্য হিসেবে স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্য (এমপি) এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে রাখার ফলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর সরকারের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে। খসড়া আইনে রহিত হওয়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ‘সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন হবে না’ বাক্যটি বাদ দেওয়া হয়েছে। একদিকে কমিশনকে স্বাধীন সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্যদিকে এর স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা রক্ষাকারী ভাষ্যকে বাদ দেওয়ার কী যৌক্তিকতা থাকতে পারে! তাছাড়া, কমিশনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে অধ্যাদেশে কমিশনার হিসেবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও নারীদের অন্তর্ভুক্তির বাধ্যবাধকতার যে বিধান রাখা হয়েছিল, তার পরিবর্তে ‘যোগ্য প্রার্থী’ প্রাপ্তির শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা কমিশনকে ‘পুরুষতান্ত্রিক’ ও ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতান্ত্রিক’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে।
খসড়া আইনটিতে কমিশনের স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা রক্ষাকারী মূল ভাষ্য বাদ দেওয়া এবং কমিশনার নিয়োগের বাছাই কমিটিতে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাখার সমালোচনা করেছে টিআইবি। সংস্থাটির আশঙ্কা, এই ধরনের স্ববিরোধী ও আত্মঘাতী পদক্ষেপ স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনকে আবারও আমলাতন্ত্রের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন একটি ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে
কমিশনের মোট জনবলের ৩০ শতাংশ প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রেষণে এবং একজন সরকারি কর্মচারীকে স্বীয় পদে চাকরিরত অবস্থায় ছুটি নিয়ে কমিশনার হিসেবে নিয়োগের সুযোগ রাখার মাধ্যমে সংস্থাটিকে মূলত পূর্বের ন্যায় আমলাতন্ত্র তথা সরকারের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন একটি ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। এই উদ্যোগকে স্ববিরোধী এবং চূড়ান্ত বিবেচনায় আত্মঘাতী বলে মনে করেন ড. জামান।
আরএম/এমএআর/
