বিজ্ঞাপন

দারিদ্র্য-বঞ্চনা পেরিয়ে তিন কন্যাকে নিয়ে এক মায়ের অনন্য যাত্রা

দারিদ্র্য-বঞ্চনা পেরিয়ে তিন কন্যাকে নিয়ে এক মায়ের অনন্য যাত্রা

দারিদ্র্য, বঞ্চনা, সামাজিক কটূক্তি, স্বামীর অকাল মৃত্যু এবং চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও হার মানেননি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বিজলী দাশ। জীবনের প্রতিটি ধাপে সংগ্রামকে সঙ্গী করে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে তিন কন্যাকে উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। সমাজের অবহেলা, ছেলে সন্তান না হওয়ার কারণে কটূক্তি, আর্থিক সংকট, সব বাধা অতিক্রম করে তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন মায়ের ইচ্ছাশক্তি ও আত্মত্যাগের কাছে কোনো প্রতিবন্ধকতাই বড় নয়। দীর্ঘ সংগ্রাম, পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আজ তিনি শুধু একজন সফল মা নন, সমাজের জন্য অনুকরণীয় এক নারীর নাম।

বর্তমানে তার তিন কন্যাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। বড় মেয়ে লিনা দাশ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে বর্তমানে আনোয়ারার বারখাইনের পদ্মপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন। দ্বিতীয় কন্যা কলি দাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করে ৩৯তম বিশেষ বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন। তৃতীয় কন্যা লিপি দাশ চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজের গণিত বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাতকানিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত চরতি গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্ম বিজলী দাশের। ছোটবেলা থেকেই অভাব-অনটনের মধ্যে বেড়ে ওঠা তার। সে সময় গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। ফলে অল্প বয়সেই তাকে আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন গ্রামে বিয়ে দেওয়া হয়। 

বিয়ের পর সংসারের দায়িত্ব সামলেও পড়াশোনা চালিয়ে যান বিজলী দাশ। গর্ভে সন্তান ধারণ করেও রাত জেগে পড়াশোনা করেছেন তিনি। সংসারের কাজ শেষ করে গভীর রাতে বই নিয়ে বসতেন। অদম্য চেষ্টায় তিনি এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তবে সংসারের চাপ ও বাস্তবতার কারণে আর উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে পারেননি।

বিজলী দাশ

নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন সন্তানদের মাধ্যমে পূরণ করার প্রত্যয় নিয়েই এগিয়ে যান তিনি। পরপর তিন কন্যাসন্তানের জন্মের পর সমাজের নানা কটূক্তি ও অবহেলার শিকার হন। ছেলে সন্তান না হওয়ায় তাকে হেয় করা হলেও দমে যাননি তিনি। এ সময় পাশে ছিলেন তার স্বামী।

তবে হঠাৎ স্বামীর মৃত্যুতে তিন ছোট মেয়েকে নিয়ে চরম সংকটে পড়েন বিজলী দাশ। শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকেও কোনো সহযোগিতা পাননি। বরং সম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত করা হয় তাকে। এরপর থেকেই শুরু হয় তার কঠিন সংগ্রাম। দিন-রাত পরিশ্রম করে তিন মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন তিনি। নিজের কষ্ট আড়াল করে সন্তানদের মানুষ করতে নিরলস পরিশ্রম করেছেন। একজন মা হিসেবে শুধু দায়িত্বই পালন করেননি, ছিলেন সন্তানদের শিক্ষক, অভিভাবক ও সাহসের উৎস।

সংগ্রামী এই মা বিজলী দাশ ঢাকা পোস্টকে বলেন, একজন মায়ের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো সন্তানদের মানুষ করে তোলা। নিজের জীবনের কষ্ট, অন্ধকার ও অপূর্ণতাকে শক্তিতে রূপান্তর করেই আমি মেয়েদের জন্য আলোর পথ তৈরি করেছি। মেয়েদের সুযোগ দিলে তারাও সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য গর্ব বয়ে আনতে পারে। আমার  জীবনের এই কষ্ট শুধু একজন মায়ের সংগ্রামের জীবন কাহিনি নয় এটি ছিল অদম্য ইচ্ছে শক্তি। আমার দীর্ঘ সংগ্রামের এই আত্মত্যাগকে সম্মান জানিয়ে আমি ‘রত্নগর্ভা মা’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি। এটি আমার জন্য বড় গর্বের বিষয়।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা পোস্ট নারীদের নিয়ে যে আয়োজন করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এ ধরনের উদ্যোগ দেশের নারীদের সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগাবে।

এনামুল হক নাবিদ/এমআর/