রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় শোক, বিভ্রান্তি ও অভিযোগে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ফ্লোর। কী কারণে এই শিশুদের মৃত্যু হয়েছে—তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো দিতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
তবে পুলিশ সূত্র ও স্বজনদের অভিযোগ, পোস্ট অপারেটিভ কক্ষে দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকার কারণেই নবজাতকদের মৃত্যু হয়েছে।
বুধবার (২৭ মে) সকালে হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ রুমের সামনে গিয়ে দেখা যায়, একের পর এক স্বজনের আহাজারি। কারও কোলে সদ্যোজাত শিশুর নিথর দেহ, পাশে বসে আছেন সদ্য সিজারিয়ান অপারেশন হওয়া মা—যিনি নিজেই ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছেন না, অথচ সন্তানের মৃত্যু মেনে নেওয়ার যুদ্ধ করছেন।
যে সময়ে নবজাতকদের মায়ের বুকের উষ্ণতায় থাকার কথা, সেই নবজাতকদের মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পরিবারগুলো। অনেক মা এখনো অপারেশনের ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেননি। মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণের আগেই তারা সন্তানের মরদেহের পাশে বসে আছেন।

স্বজনদের অভিযোগ, মঙ্গলবার রাত থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাতে নবজাতকদের দেখতে দিচ্ছিল না। রাত থেকে পোস্ট অপারেটিভ রুমে প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছিল বলেও অভিযোগ করেন তারা।
কেরানীগঞ্জের নাদিমের ভাতিজাও মারা গেছে এই ঘটনায়। তিনি বলেন, গতকাল রাত থেকেই কাউকে ভেতরে যেতে দেওয়া হচ্ছিল না। নার্সরা রাতে বলেছিল, এসিতে সমস্যা। সকালে দেখি একে একে শিশুদের বের করে আনা হচ্ছে। কেউ বমি করছে, কারও শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সকালেই আমার ভাইয়ের ছেলে মারা যায়।
পোস্ট অপারেটিভ রুমের সামনে বসে ছিলেন শারমিন আক্তার। তার কোলে ভাইয়ের এক দিন বয়সী ছেলের নিথর দেহ। পাশে বসা শিশুটির মা—গতকালই তার সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে। নিজের সন্তানের মরদেহ কোলে নেওয়ার শক্তিও নেই তার।
শারমিন বলেন, আমার ভাইয়ের ছেলে গতকালও সুস্থ ছিল। কোনো সমস্যা ছিল না। আমার মা পোস্ট অপারেটিভ রুমে ঢুকেছিলেন। এসি বন্ধ থাকায় ভেতরে দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা ছিল। তিনি অসুস্থ হয়ে দ্রুত বের হয়ে আসেন। আমরা কর্তৃপক্ষকে বললেও তারা গুরুত্ব দেয়নি। সকালে দেখি আমার ভাইয়ের ছেলে বমি করছে। কিছুক্ষণ পর মারা যায়।

আরও কয়েকজন স্বজন অভিযোগ করেন, পোস্ট অপারেটিভ ফ্লোরে কোনো পুরুষ স্বজনকে যেতে দেওয়া হচ্ছিল না। ভেতরে যেসব স্বজন প্রবেশ করেছিলেন, তাদের দাবি—সেখানে বাতাস চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না।
আবু বক্কর নামে এক স্বজন বলেন, আমার বোনের মেয়ে আইসিইউতে ভর্তি। আজ সকালে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে। যেখানে শিশুদের রাখা হয়েছিল, সেই পরিবেশ খুব খারাপ। রাত থেকে কাউকে শিশুদের দেখতে দেওয়া হয়নি। তাদের ব্যবস্থাপনা খুবই খারাপ। আমরা দেখেছি, অনেক শিশুকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সরানো হয়েছে। এত বড় ঘটনা হলেও স্বজনদের কিছু জানানো হয়নি।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ঘটনাটি ঘটেছে তাদের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে।
হাসপাতালের পরিচালক প্রফেসর ড. নাহিদা ইয়াসমিন বলেন, যে ওয়ার্ডে ঘটনাটি ঘটেছে সেখানে ১১ জন মা ছিলেন, আর নবজাতক ছিল ৬ জন। এটি আমাদের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ড। এখানে ডেলিভারির পর মা-বাচ্চার সঙ্গে একজন করে থাকেন। বাচ্চারাও মায়ের পাশেই ছিল।
তিনি বলেন, যেহেতু এটি এসি ওয়ার্ড, রাতে মায়েরা ঠান্ডা লাগার কথা বলে দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সদের এসি বন্ধ করতে বলেছিলেন। রাত ৩টার দিকে দুই শিশু অসুস্থ হলে তাদের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা দেখে তাদের ভালো আছে বলে আবার ওয়ার্ডে পাঠাতে বলেন। পরে সকাল ৬টার দিকে মায়েরা জানান, শিশুদের অসুস্থ মনে হচ্ছে। তখন ৬ শিশুকেই এনআইসিইউতে নেওয়া হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই শিশু এনআইসিইউতে নেওয়ার পথেই মারা যায়। বাকি চার শিশুর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কাউকেই বাঁচানো যায়নি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে ৬ নবজাতকের মৃত্যু হয়।
তবে এতসব ঘটনার পরও প্রশ্ন রয়ে গেছে—কী কারণে একসঙ্গে প্রাণ গেল ৬ নবজাতকের? সেই উত্তর এখনো মেলেনি।
এমএসি/জেডএস
