প্রতিদিন সিগন্যালে দাঁড়াতে হয় সিয়ামকে। গাড়ি থামলেই ছোটাছুটি শুরু হয় তার। হাতে কয়েক সেট বই নিয়ে কড়া নাড়তে হয় প্রাইভেটকার আর মাইক্রোবাসের জানালায়। দুই সেট বই বিক্রি করতে পারলে লাভ থাকে ১০০ টাকা। সেই টাকাই তুলে দেয় মায়ের হাতে। বাবার রেখে যাওয়া ঋণের ভার টানতে টানতেই ছোট্ট সিয়ামের শৈশব এখন জড়িয়ে গেছে সংসারের হিসাব-নিকাশে।
রাজধানীর ব্যস্ততম মগবাজার-হাতিরঝিল সিগন্যালে প্রায়ই দেখা মেলে এই শিশুটির। প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু হয় তার কাজের দৌড়ঝাঁপ। গাড়ির সারি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে তার ব্যস্ততাও। তবে সব দিনই বই বিক্রি হয় না। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে ফিরতে হয় তাকে।
স্কুল ছুটি হওয়ার পর প্রতিদিন রাস্তায় সিগন্যালে এসে বই বিক্রি করে সিয়াম। এ আয় দিয়েই চলে তাদের সংসারের খরচ
এবারের ঈদুল আজহার ছুটির আগের দিন তথা গত ২৪ মে সিয়ামকে দেখা যায় একইভাবে। ব্যস্ত সড়কে হাতে বই নিয়ে এক গাড়ি থেকে আরেক গাড়ির জানালায় কড়া নাড়ছে সে। তার ডাকে কেউ সাড়া দেন, আবার কেউ ফিরিয়ে দেন। সেদিন সকাল থেকে পাঁচ সেট বই বিক্রি করতে পেরেছিল শিশুটি।
খেলার বয়সে কাঁধে সংসারের বোঝা
সিয়ামের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা পোস্টের। শিশুটি জানায়, মায়ের সঙ্গে হাতিরঝিলের বেগুনবাড়ি সিদ্দিক মাস্টারের ঢাল এলাকায় থাকে। সেখানকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে লেখাপড়া করে। স্কুল ছুটি হওয়ার পর প্রতিদিন রাস্তায় সিগন্যালে এসে বই বিক্রি করে। এ আয় দিয়ে সংসারের খরচ জোগায়।
সিয়াম বলে, ‘আমার বাবা ছিল ঠিকই। কিন্তু মারে ঋণের নিচে রাইখা উনি চইলা গেছে গা। উনি গাড়ি কিনা চালাইবো, দোকান দিবো- এরকম কইরা কইতে কইতে অনেক টাকা মায়েরে দিয়া কিস্তিতে টাকা লওয়াইল। সুদের থেইকাও নিছে।’
লাখ দুয়েক টাকা ঋণ করে মাকে ছেড়ে চলে যান বাবা। এরপর সেই ঋণ শোধে মা-ছেলে মিলে নেমেছেন জীবনসংগ্রামে
পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া শিশুটির ভাষ্য, ঋণ করে লাখ দুয়েক টাকা নিয়ে মাকে তালাক দেন বাবা। এরপর এ টাকা পরিশোধের জন্য মা-ছেলে মিলে বই বিক্রিতে নামেন। স্কুল বন্ধ থাকলে সকাল থেকেই কাজ শুরু করে। নয়তো ছুটির পর সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় দিতে হয়।
সিয়াম বলে, ‘বিভিন্ন সিগন্যালে গাড়ি থামলে আমরা এসব বই বিক্রি করি। এক সেট বইয়ের দাম ৫০ টাকা। কিন্তু আমাদের ১০০ টাকায় বেচতে হয়। দৈনিক পাঁচ সেট বেচতে পারলে আড়াইশ টাকা লাভ থাকে। টাকাটা আমার মায়ের হাতে দেই।’
ঈদের ছুটি হোক কিংবা সাধারণ দিন, কাজ থামে না সিয়ামদের। কারণ প্রতিদিন কাজ না করলে জোটে না খাবার
সিয়ামের মা মোর্শেদা বেগম বলেন, হকারি করেই এখন আমার সংসার চালাতে হয়। এর মধ্যে স্বামীর রেখে যাওয়া ঋণের টাকাও পরিশোধ করতে হয়। একজনের আয় দিয়ে না চলার কারণে ছেলেও সহায়তা করে। তবে একেক সময় একেক জিনিস বিক্রি করি। অর্থাৎ বই, তোয়ালে, পানি, ফুল, বেলুন- যখন যা পাই, তখন তা-ই বিক্রি করতে হয়।
বাবার রেখে যাওয়া ঋণ শোধে জীবনযুদ্ধে মা-ছেলে
সিয়ামের মা আরও বলেন, “আমার স্বামী তো ঋণে ফালাইয়া চইলা গেছে গা। পরে সে আরেক জায়গায় বিয়া করছে। এখন এই হকারিই কইরা ঋণ শোধ দেই। প্রতিদিন কাজ না করলে পেটে ভাত ঢুকবে না। আমরা ‘দিন আনি দিন খাই’ মানুষ। ঈদের ছুটি হোক আর না হোক, আমগো জন্য কাজ থামে না। কষ্ট কইরা বাঁচি, না করলে না খাইয়া থাহি। আমগো দেখনের কেউ নাই।”
সিগন্যালের লাল আলো জ্বললে যেখানে থেমে যায় গাড়ি, সেখানে থেমে থাকে না সিয়ামের জীবন। তার মতো অসংখ্য শিশুর শৈশব এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে জীবিকার তাড়নায়। যাদের থাকার কথা পড়ার টেবিলে কিংবা খেলার মাঠে, কিন্তু এখন দাঁড়িয়ে থাকতে হয় সিগন্যালে।
এমআরআর/বিআরইউ
