কয়েক দিন ধরেই আনোয়ারার সিংহরা গ্রামের বৃদ্ধ দুর্গাপদ মল্লিকের মনটা মাটির টানে ছটফট করছিল। নিজ গ্রামে ফিরবেন। বাবার সেই আকুতি ফেলতে পারেননি বড় ছেলে বিধান মল্লিক। পেশায় স্কুল শিক্ষক বিধান সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, নিজেই মোটরসাইকেলে করে বাবাকে গ্রামে রেখে আসবেন।
সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় স্ত্রী তিন্নি মল্লিককে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, বাবাকে রেখে সরাসরি স্কুলে চলে যাবো। আর সন্ধ্যার আগেই তোমার আর বাচ্চাদের কাছে ফিরে আসবো। বাবার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে, তিনি ফিরেছেন নিজ গ্রামে। তবে জীবিত মানুষ হিসেবে নয়, নিথর দেহ হয়ে। আর বাবার সঙ্গী হওয়া ছেলে বিধান মল্লিকেরও ফেরা হয়নি ঘরে। এক মাছের পিকআপের বেপরোয়া গতি কেড়ে নিয়েছে দুই প্রজন্মের দুটি তাজা প্রাণ।
মঙ্গলবার (২ জুন) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কর্ণফুলীর শাহ আমানত সেতু এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান বাবা দুর্গাপদ মল্লিক (৭০) ও ছেলে বিধান মল্লিক (৪৭)।
জানা যায়, চট্টগ্রাম নগর থেকে আনোয়ারার দূরত্ব খুব বেশি না হওয়ায় মোটরসাইকেলের পেছনে বাবাকে বসিয়ে সাবধানেই এগোচ্ছিলেন কর্ণফুলীর দৌলতপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক বিধান মল্লিক। কিন্তু শাহ আমানত সেতু থেকে নামার সময় গতিরোধক পেরোতেই পেছন থেকে মাছবাহী একটি পিকআপ ভ্যান তীব্র গতিতে মোটর সাইকেলটিকে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার চোটে পেছনে বসা বৃদ্ধ দুর্গাপদ মল্লিক ছিটকে পড়েন পিকআপের চাকার নিচে। ঘটনাস্থলেই পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান তিনি। আর গুরুতর আহত অবস্থায় ছেলে বিধান মল্লিককে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সিএনজিচালক মো. জামাল উদ্দীন বলেন, সেতু থেকে নামার মুখে একসঙ্গে কয়েকটি গতিরোধক ও একটি বড় গতিরোধক (স্পিড ব্রেকার) রয়েছে। যেখানে সব গাড়িকেই গতি কমাতে হয়। কিন্তু পেছন থেকে আসা একটি মাছবাহী পিকআপ ভ্যান তীব্র গতিতে মোটর সাইকেলটিকে ধাক্কা দেয়।

চমেকের করিডোরে স্তব্ধতা, স্বজনদের আহাজারি
মঙ্গলবার দুপুরের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে গিয়ে দেখা গেল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুটি অ্যাম্বুলেন্স। ভেতরে শুয়ে আছেন বাবা আর ছেলে। অ্যাম্বুলেন্সের দরজা ধরে অঝোরে কাঁদছিলেন দুর্গাপদ মল্লিকের আরেক ছেলে বাবলা মল্লিক।
বিলাপ করতে করতে বাবলা বলেন, বড় ভাই সকালে বলল বাবাকে গ্রামে রেখে স্কুলে যাবে। বিকেলে শহরে ফিরবে। কে জানত, দুজনেই এভাবে চলে যাবে। আমি একসঙ্গে বাবা আর ভাইকে হারালাম। এখন আমি কাকে নিয়ে বাঁচব?
অন্যদিকে, কিছুক্ষণ পর পরই জ্ঞান হারাচ্ছিলেন বিধান মল্লিকের স্ত্রী তিন্নি মল্লিক। তার দুই মেয়ে আর এক ছেলের কান্না যেন থামানোই যাচ্ছিল না। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া বড় মেয়েটি বাবার মরদেহ জড়িয়ে ধরে বারবার বলছিল, আমার বাবাকে এনে দাও। আমার বাবা আমাকে খুব আদর করত।
দুর্ঘটনায় মৃত বিধান মল্লিক স্ত্রী তিন্নি মল্লিক বিলাপ করে বলেন, রাস্তাঘাটে বেপরোয়া গাড়ির যদি একটু লাগাম থাকত, তাহলে এভাবে আমার গোছানো সংসারটা এক নিমেষে ছারখার হয়ে যেত না। এখন আমি এই তিন সন্তানকে নিয়ে কোন সাগরে ভাসব, কে দেবে আমাদের সান্ত্বনা?
ছায়া সুনিবিড় গ্রামে এখন শুধুই শোকের মাতম
এদিকে, আনোয়ারা উপজেলার চাতরী ইউনিয়নের সিংহরা গ্রামে দুর্গাপদ মল্লিকের বাড়িতেও চলছে শোকের মাতম।
স্থানীয় বাসিন্দা অরুণ মল্লিক বলেন, বিধান শুধু শিক্ষকই ছিল না, তিনি আমাদের এলাকার সম্পদ ছিলেন। গ্রামের ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খোঁজ নিতেন। আর বৃদ্ধ বাবার প্রতি তার যে ভক্তি ছিল, তা আজ এক ট্র্যাজেডিতে রূপ নিল।
পরিবারের পুত্রবধূ আন্নি সেনের কণ্ঠেও একই আর্তনাদ, সকালে দুজন মানুষ সুস্থ শরীরে হাসিমুখে বের হলো, আর বিকেলে লাশ হয়ে ফিরল। এই দৃশ্য কীভাবে মেনে নেওয়া যায়?
দৌলতপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নাছির উদ্দীন বলেন, বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক হিসেবে বিধান মল্লিক শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও আন্তরিক ছিলেন। তার এই অকাল প্রয়াণে পুরো বিদ্যালয় পরিবার স্তম্ভিত।
এ দুর্ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনূর আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, দুর্ঘটনার পর পরই ঘাতক পিকআপ ভ্যানটি জব্দ করা হয়েছে। চালক পালিয়ে গেলেও তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে। এই ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে পরিবার।
এছাড়া, চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর তালুকদার জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের অনুরোধে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দুটি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
আজ বিকেলেই বাবা-ছেলের মরদেহ পৌঁছায় আনোয়ারার গ্রামের বাড়িতে। রাতে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সেখানেই তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। বাবার শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে ছেলেও হলেন চিরকালের সহযাত্রী, এমন করুণ বিদায় যেন সইতে পারছে না গ্রামের কোনো মানুষই।
জেআই/এসএম
