ঢাকার মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগমের অবহেলাজনিত মৃত্যুর পর তার ছেলে সরকারের যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমানকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে বিদ্যমান আইনে ভুক্তভোগী পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ছাড়া আদালত কর্তৃক অপরাধ আমলে নেওয়ার সুযোগ না থাকায়, এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ নিয়ে বড় ধরনের জটিলতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার পর আবারও আলোচনায় এসেছে ২০১৩ সালের ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’। ২০২৩ সালে এ আইনের বিধিমালাও প্রণয়ন করা হয়।
আরও পড়ুন
আইনটির ৩ ধারায় প্রত্যেক সন্তানের জন্য পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। একইসঙ্গে পিতা-মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করা এবং পৃথকভাবে বসবাস করলে নিয়মিত সাক্ষাৎ করার কথাও বলা হয়েছে।
আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে, ধারা ৩-এর কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড অনাদায়ে অনূর্ধ্ব তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া পিতা-মাতার ভরণপোষণে বাধা বা অসহযোগিতা করলে সন্তানের স্ত্রী, স্বামী, পুত্র-কন্যা বা অন্য নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধেও একই ধরনের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
তবে আইনটির প্রয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আইনের ৭ ধারায় বলা হয়েছে, এ আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধ প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিচারযোগ্য।
একই ধারার উপধারা (২)-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সন্তানের পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ছাড়া কোনো আদালত এ আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধ আমলে নিতে পারবে না।
এ কারণে নুরজাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় ভরণপোষণ আইন প্রয়োগ করা আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ২০১৩ সালে দেশে ‘পিতামাতার ভরণপোষণ আইন’ প্রণয়ন করা হয় বৃদ্ধ পিতামাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে। আইনে প্রতিটি সন্তানকে সমানভাবে দায়িত্বশীল করা হয়েছে। কোনো সন্তান দায়িত্ব পালন না করলে এক লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তিনি বলেন, আইনের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো পিতা-মাতার লিখিত অভিযোগ ছাড়া কোনো ম্যাজিস্ট্রেট এ অপরাধ আমলে নিতে পারেন না। যদিও এটি একটি আমলযোগ্য অপরাধ এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চাইলে মামলা রুজু করতে পারেন, বাস্তবে বিষয়টি পারিবারিক সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় এ ধরনের মামলার নজির খুব কম।
ইশরাত হাসান বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাবা-মা চরম নিরুপায় হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হলেও পরে সন্তানদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলতে দেখে আবেগের বশে আপস করে মামলা প্রত্যাহার করে নেন।
বর্তমান ঘটনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে বৃদ্ধা মা সন্তানের খোঁজখবর না পেয়ে মারা গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, তার মৃত্যুর পর পিতামাতার ভরণপোষণ আইন কার্যকর করার সুযোগ কার্যত আর নেই। কারণ, আইন অনুযায়ী তাঁর লিখিত অভিযোগ ছাড়া অপরাধ আমলে নেওয়ার বিষয়টি বাধাগ্রস্ত হয়।
তবে তিনি মনে করেন, এ ঘটনায় দণ্ডবিধির ৩০৪-এর ‘এ’ ধারায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করার সুযোগ রয়েছে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, কাউকে প্রয়োজনীয় যত্ন বা ‘ডিউ কেয়ার’ না দিয়ে অবহেলায় রাখা হলে এবং এর ফলে তার মৃত্যু ঘটলে সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
ইশরাত হাসান বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রভাবশালী বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হলেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উচিত ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা। এ ক্ষেত্রে সন্তানদের জিজ্ঞাসাবাদ, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং অন্যান্য আলামত যাচাই করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ভরণপোষণ আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও আইনের ৭ ধারার কারণে মন্ত্রণালয়ের সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সীমিত। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা বা ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিংস শুরু করার সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশে স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ কিংবা নারী নির্যাতন সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা বেশি হলেও পিতা-মাতার ভরণপোষণ ইস্যুতে মামলা তুলনামূলকভাবে কম। এর কারণ সামাজিক বাস্তবতা। অধিকাংশ বাবা-মা সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য নিজের সম্পদ বিক্রি করতেও দ্বিধা করেন না। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে অবহেলার শিকার হলেও সন্তানের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার মতো মানসিক বা শারীরিক সক্ষমতা অনেকের থাকে না। ফলে আইনটির কার্যকারিতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংস্কারের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আইন সচিব লিয়াকত আলী মোল্লাকে একাধিকবার ফোনকল দিলেও তিনি ধরেননি।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির ঢাকা পোস্টকে বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে পুলিশ সেই প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তার আগে কিছু বলা যাচ্ছে না।
গত ৩১ মে ঢাকার মিরপুর-১১ নম্বরে একটি বাসা থেকে নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯–এ ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহটি পচে গিয়ে পোকা ধরেছিল। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। তারা আরও বলেন, বাসাটি ছিল অত্যন্ত নোংরা ও অগোছালো।
নুরজাহান বেগম তার মেয়ের বাসায় থাকতেন। বাসাটির পরিবেশও ছিল অপরিচ্ছন্ন। তার এক ছেলে যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং এক মেয়ে স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষক।
নুরজাহান বেগমের মৃত্যুর পর তার সন্তানদের দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে বৃদ্ধ পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইনের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব প্রয়োগ নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এসএইচআর/এমএসএ
