বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ‘পুশ-ইন’ ইস্যু। কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের উত্তর, উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ নারী-শিশুসহ বহু মানুষকে বাংলাদেশে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তৎপরতায় একের পর এক পুশ-ইনের অবৈধ চেষ্টা ব্যর্থ হলেও ঘটনাগুলো দুদেশের সম্পর্ক, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এরই মধ্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) মহাপরিচালক পর্যায়ের চার দিনব্যাপী সীমান্ত সম্মেলন শুরু হচ্ছে আজ সোমবার (৮ জুন)। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিএনপি সরকারের আমলে এটাই প্রথম সীমান্ত সম্মেলন।
মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন করে বিএসএফ কর্তৃক সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইন ও আকাশসীমা লঙ্ঘন করে সীমান্তে ড্রোন-হেলিকপ্টার ব্যবহারের কারণে বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা ক্রমশই বাড়ছে। এমন প্রেক্ষাপটে এবারের সীমান্ত সম্মেলন থেকে নয়াদিল্লিকে কড়া বার্তা দিতে চায় বিজিবি।
বিজিবি সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক প্রত্যেকটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের ঘটনা ও অপরাধমূলক কার্যক্রমের ফিরিস্তি তুলে ধরা হবে এবারের সীমান্ত সম্মেলনে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিজিবি সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ডিজি পর্যায়ের এবারের সীমান্ত সম্মেলনে বিজিবির মূল এজেন্ডাই থাকবে সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন। এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট তথ্য তুলে ধরে কড়া প্রতিবাদ জানানো হবে। পাশাপাশি বিএসএফ কর্তৃক আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য তুলে ধরা হবে।
তিনি বলেন, এছাড়াও আকাশসীমা লঙ্ঘন করে ভারতের ড্রোন-হেলিকপ্টার ব্যবহার, মাদকসহ চোরাচালান, অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপন, স্থায়ী সীমান্ত পিলার স্থাপন এবং আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা বন্ধসহ গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা বৈঠকে তুলে ধরবে বিজিবি। থাকবে ভারতীয় গণমাধ্যমে সীমান্তকেন্দ্রিক উসকানিমূলক মিথ্যা সংবাদের প্রতিবাদও।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পুশ-ইন ইস্যু এখন শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। আর সেই কারণেই সীমান্তের জিরো লাইনে আটকে থাকা কয়েকশ মানুষের গল্প এখন দুদেশের সম্পর্কের একটি বড় পরীক্ষায় রূপ নিয়েছে।
২৩টি পুশ-ইনের চেষ্টা ঠেকিয়েছে বিজিবি
বিজিবি সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত চার দিনে ঝিনাইদহ সীমান্ত, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বঙ্গাবাড়ী সীমান্ত, নওগাঁর সাপাহার উপজেলার হাপানিয়া, লালমনিরহাটের বারখাতা, পাটগ্রাম ও আশপাশের সীমান্ত এলাকা এবং পঞ্চগড় সীমান্ত দিয়ে সরাসরি বিএসএফের সহযোগিতায় ২৩টি পুশ-ইনের ঘটনায় দুই শতাধিক ব্যক্তিকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা হয়েছিল। প্রত্যেকটি পুশ-ইন বিজিবি দৃঢ়তার সাথে ঠেকিয়ে দেয়।
২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ৪৬৩ জনকে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে শতাধিক ব্যক্তিকে পরে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়। আবার কয়েকশ রোহিঙ্গাও ছিল বলে দাবি করা হয়েছে
বিজিবি বলছে, এসব ঘটনায় সীমান্তে টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা বজায় রাখা হয়েছে।

বিজিবির অভিযোগ, পুশ-ইনের ঘটনায় কোনো ধরনের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া, নাগরিকত্ব যাচাই কিংবা আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন ব্যবস্থা অনুসরণ করা হচ্ছে না বিএসএফের পক্ষ থেকে।
অন্যদিকে ভারতীয় পক্ষের দাবি, যাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে তারা বাংলাদেশি নাগরিক। তবে ঢাকা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যাচাই ছাড়া কাউকে গ্রহণ করা হবে না।

শুধু সাম্প্রতিক নয়, দীর্ঘদিনের অভিযোগ
পুশ-ইন ইস্যু নতুন নয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ৪৬৩ জনকে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে শতাধিক ব্যক্তিকে পরে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়। আবার কয়েকশ রোহিঙ্গাও ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
কোনো ব্যক্তিকে অন্য দেশের নাগরিক দাবি করলেই তাকে সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া যায় না। এর জন্য নাগরিকত্ব যাচাই, কনস্যুলার যোগাযোগ, তথ্য বিনিময় এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সম্মতিপূর্ণ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। ‘ডিউ প্রসেস’ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া পুশ-ইন আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার নীতির পরিপন্থি। এমন পদক্ষেপ দুদেশের মধ্যে আস্থার সংকটও তৈরি করতে পারে
২০২৫ সালে পুশ-ইন ২৩৪৪ জন, এর মধ্যে ভারতীয় ১২৬
বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৩৪৪ জনকে পুশ-ইন করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই বাংলাদেশি নাগরিক। ১২৬ জন ভারতীয় ও ৩৯ জন রোহিঙ্গা নাগরিক।
গত মে মাস থেকে শুরু করে চলতি জুন মাসে বিএসএফ বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে দুই শতাধিক মানুষকে পুশ-ইন করার চেষ্টা করেছে। এখনো চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
আইন কী বলে?
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ব্যক্তিকে অন্য দেশের নাগরিক দাবি করলেই তাকে সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া যায় না। এর জন্য নাগরিকত্ব যাচাই, কনস্যুলার যোগাযোগ, তথ্য বিনিময় এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সম্মতিপূর্ণ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। ‘ডিউ প্রসেস’ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া পুশ-ইন আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার নীতির পরিপন্থি। এমন পদক্ষেপ দুদেশের মধ্যে আস্থার সংকটও তৈরি করতে পারে।

যাচাই ছাড়া গ্রহণ নয়
বিজিবি সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম ঢাকা পোস্টকে বলেন, কেউ বাংলাদেশি হলে তাকে গ্রহণে আপত্তি নেই। কিন্তু প্রথমে প্রমাণ দিতে হবে। শুধু সীমান্তে এনে ছেড়ে দিলে বাংলাদেশ তা গ্রহণ করবে না।
তিনি বলেন, অনবরত পুশ-ইনের চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রত্যেকটা পুশ-ইনের ঘটনায় আমরা বাধা দিয়েছি, ঘটতে দেইনি। অবশ্যই এটা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার আইনের ব্যত্যয়, দেশীয় আইনেরও ব্যত্যয়। কোনো ফরম্যাটেই এটা বৈধতার সুযোগ নেই৷
তিনি বলেন, জানুয়ারির দিকে ১০-১২ জনকে পাঠানোর চেষ্টা হয়েছে। এরকম কিছু করতে হলে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, যার লম্বা প্রসিডিউর আছে। এক দেশের গরুও যদি আরেক দেশে পাঠায়, সে ক্ষেত্রেও ব্যবসায়িক চুক্তি প্রসিডিউর থাকে। এ ক্ষেত্রে মানুষকে কীভাবে রাতের অন্ধকারে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ? জেনে-শুনে বুঝেই করা হচ্ছে, যেটা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
সীমান্তে সশস্ত্র নজরদারি-টহল বাড়িয়েছে বিজিবি
বর্ডার ল (আইন) সম্পর্কে তিনি বলেন, দেড়শ গজের বাইরে যা কিছু করার করতে পারে। বর্ডারের দেড় শ গজের ভেতরে জিরো লাইনে কোনো স্থাপনা করা যাবে না। সীমান্তে বিএসএফ তথা ভারতীয়দের দ্বারা চরমমাত্রায় মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনের লঙ্ঘন করা হচ্ছে। আমরা প্রতিটি ঘটনায় ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাচ্ছি। সীমান্তে নজরদারি আগের চেয়ে অনেক বাড়ানো হয়েছে। সশস্ত্র অবস্থায় পর্যাপ্ত সংখ্যক বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কোম্পানি কমান্ডার, ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লেভেলে পতাকা বৈঠকের ওপর বৈঠক হচ্ছে।
সীমান্ত সম্মেলনে বিজিবির এজেন্ডায় আরও যা থাকছে
সীমান্ত সম্মেলনে অংশ নিতে যাওয়া সরকারের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা জানান, সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন ইস্যু ছাড়াও এবার বিজিবির এজেন্ডায় থাকছে ভারতীয় ড্রোন ও হেলিকপ্টার কর্তৃক বাংলাদেশের আকাশসীমায় অবৈধ অনুপ্রবেশ। সীমান্তের নদী ও পাহাড়বেষ্টিত দুর্গম এলাকায় নজরদারির জন্য প্রায়ই ড্রোন ওড়াচ্ছে বিএসএফ। দেশের উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি এলাকায় ভারতীয় হেলিকপ্টার প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশের আকাশসীমায় অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে জিরো টলারেন্স নীতির কথা জানাবে বিজিবি। পাশাপাশি আগরতলার শিল্পবর্জ্য ত্রিপুরার চার খাল দিয়ে বাংলাদেশের আখাউড়ায় প্রবেশ করে। এতে এলাকার ফসলি জমির উর্বরতা কমে গেছে, পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। এটি বন্ধে আখাউড়ায় বর্জ্য শোধনগার বা ইটিপি স্থাপন করতে চায় বাংলাদেশ। এই ইটিপি স্থাপনের খরচ ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে বহন করার প্রস্তাব দেবে বিজিবি। আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য অবস্থান ও তাদের কর্মকাণ্ডে ভারতীয় সংশ্লেষ ও সহযোগিতার তথ্য তুলে ধরে তা বন্ধের বিষয়ে আলোচনা করবে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল।
বিজিবি মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে এবারের চার দিনব্যাপী সীমান্ত সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে ১৫ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল।
প্রতিনিধিদলে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর এবং যৌথ নদী কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অপরদিকে বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমারের নেতৃত্বে সম্মেলনে অংশ নেবে ভারতীয় প্রতিনিধিদল। এতে বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়াও দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অন্য সংস্থার কর্মকর্তারা প্রতিনিধিত্ব করবেন।
জেইউ/এমএসএ
