জাতীয় সংসদে ঠিকাদারদের কাজ হাতবদল ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. আশরাফ উদ্দিন। অন্য জেলা বা বিভাগের বড় ঠিকাদাররা কাগজে-কলমে শক্তিশালী প্রোফাইল দেখিয়ে কাজ বাগিয়ে নিলেও, পরে তা স্থানীয় অযোগ্যদের কাছে গোপনে বিক্রি করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এই হাতবদলের চক্করে মূল বাজেট কমে যাওয়ায় মাঠপর্যায়ে কাজের গুণগতমান মারাত্মকভাবে নষ্ট হচ্ছে। সংসদ সদস্যের এমন গুরুতর সব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই অনিয়ম ও মহামারি রূপ নেওয়া সংকট রুখতে বিদ্যমান ক্রয় আইন বা পিপিআর পর্যালোচনার আশ্বাস দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী।
সোমবার (৮ জুন) সংসদের অধিবেশনে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন বলেন, দেশের গ্রামীণ সড়ক, সেতু, কালভার্ট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ এলজিইডির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় এলাকার কাজ অন্য জেলা বা বিভাগের ঠিকাদারদের দেওয়া হচ্ছে। এসব বহিরাগত ঠিকাদাররা নিয়মিত কাজ তদারকি করেন না এবং স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কেও তাদের কোনো ধারণা থাকে না। এর ফলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয় না এবং রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলার মতো অভিযোগ ওঠে। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় যখন এই কাজগুলো বারবার হাতবদল হয়ে স্থানীয় অযোগ্য ঠিকাদারদের কাছে চলে আসে। এতে করে মাঝখান থেকে মোটা অঙ্কের টাকা লোপাট হওয়ায় মূল কাজের বাজেট কমে যায়। পরে সেই লোকসান মেটাতে গিয়ে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হয়, যা সরাসরি কাজের গুণগতমান ধ্বংস করছে। অথচ স্থানীয় পেশাদার ঠিকাদারদের সুযোগ দেওয়া হলে তারা এলাকার ভৌগোলিক অবস্থা ও জনসাধারণের চাহিদা সম্পর্কে অবগত থাকেন এবং জনগণের কাছে সরাসরি জবাবদিহিতার ভয়ে কাজের প্রতি অধিক দায়িত্বশীল হন।
সংসদ সদস্যের এই নোটিশের জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এলজিইডির আওতায় পিপিএ ২০০৬ এবং পিপিআর অনুযায়ী মূলত দুটি পদ্ধতিতে কাজ সম্পাদন করা হয়। এর মধ্যে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট জেলার ঠিকাদাররাই অংশ নেন, যেখানে বাইরের কারও সুযোগ নেই। তবে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে শর্ত ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী দেশের যেকোনো প্রান্তের ঠিকাদার কাজ পেতে পারেন।
মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর ই-জিপির ফাঁকফোকর ও অতীতের অনিয়ম নিয়ে সম্পূরক প্রশ্ন তোলেন সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন। তিনি অভিযোগ করেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের কিছু প্রভাবশালী ঠিকাদার, যাদের প্রোফাইল কাগজে-কলমে অনেক শক্তিশালী, তারা ই-জিপির মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কাজগুলো সহজে পেয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তারা নিজেরা মাঠে কাজ না করে পর্দার আড়ালে থেকে স্থানীয় অযোগ্য লোকদের কাছে কাজগুলো কয়েক দফায় বিক্রি বা হাতবদল করছেন। দাম কমে যাওয়ার কারণে বাধ্য হয়েই স্থানীয় পর্যায়ে নিম্নমানের মালামাল দিয়ে কাজ করা হচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ সাক্ষী খোদ সংসদ সদস্যরা। এই অনিয়ম রুখতে এবং স্থানীয় ঠিকাদারদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে ঠিকাদারি পদ্ধতিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা জানতে চান তিনি।
সংসদ সদস্যদের এই উদ্বেগের সঙ্গে শতভাগ একমত পোষণ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, মাঠপর্যায়ের এই বাস্তব সমস্যা ও ভোগান্তি সম্পর্কে সরকার পুরোপুরি অবগত আছে। এই ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা ও কাজের ক্ষতিকর হাতবদল ঠেকাতে এরইমধ্যে প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। সঠিক ও যোগ্য স্থানীয় ঠিকাদাররা যাতে যথাযথভাবে কাজ পান এবং গ্রামীণ অবকাঠামোর মান বজায় থাকে, সেজন্য বিদ্যমান ক্রয় আইন বা পিপিআর কীভাবে রিভিউ বা সংশোধন করা যায়, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এসআর/এসএএস/জেডএস
