ভোক্তাপর্যায়ে প্রতি মাসেই এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার। তবে, নির্ধারিত সেই দামে সাধারণ গ্রাহকরা সিলিন্ডার কিনতে পারছেন না— এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বরাবরই বাজার ব্যবস্থাপনার কথা বললেও বাস্তবে কাগজে-কলমের সেই মূল্যের প্রতিফলন বাজারে দেখা যায় না। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিস্ট্রিবিউটর ও কোম্পানির দৌরাত্ম্যে স্থিতিশীল হতে পারছে না এলপিজি খাত।
সর্বশেষ এপ্রিল মাসের মূল্যবৃদ্ধির পর চলতি মাসে (জুন) এলপিজির দাম কিছুটা কমিয়েছে বিইআরসি। প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বাজারে গ্রাহকদের তা কিনতে হচ্ছে ২ হাজার টাকা বা তারও বেশি দামে। এমনকি সংকটকালীন প্রতি সিলিন্ডার ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বাড়তি দামেও কিনতে হয়েছে ভোক্তাদের। স্বাভাবিক সময়েও এই সংকটের স্থায়ী কোনো সমাধান আসেনি, গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত মূল্যই। এলপি গ্যাসের দামের এই নৈরাজ্যের পেছনে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকার বা বিইআরসি প্রতি মাসেই এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন নেই। সর্বশেষ ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৮৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হলেও খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকা বা তারও বেশিতে। মূলত ডিস্ট্রিবিউটর, কোম্পানি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দুষ্টচক্র বা সিন্ডিকেটের অনৈতিক মুনাফা ও মূল্য নৈরাজ্যের কারণেই ভোক্তারা এই বাড়তি দামের শিকার হচ্ছেন
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন বলেন, আমাদের এলপিজি বিক্রির রিটেইলিং বা খুচরা বাজারে অনেক বড় একটা ঘাটতি আছে। কোম্পানি থেকে ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা পর্যায় পর্যন্ত দামের একটা বড় তারতম্য হয়। এখানে ডিস্ট্রিবিউটররা একটি বড় অঙ্কের মুনাফা করে থাকেন। এখন দেখতে হবে যে এই বাড়তি টাকাটা কোম্পানি পর্যন্ত পৌঁছায় কি না। যদি পৌঁছায়, তাহলে কোম্পানি ও ডিস্ট্রিবিউটর— দুজনেই এই অনৈতিক মুনাফার জন্য দায়ী থাকবে।

অবশ্য খুচরা ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, প্রায় সব কোম্পানির সিলিন্ডারই তাদের কিনতে হয় সরকারি মূল্যের কাছাকাছি বা তার চেয়ে বেশি দামে। ফলে সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে সাধারণ গ্রাহকদের কাছে গ্যাস বিক্রি করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।
মোহাম্মদপুর টাউন হলের খুচরা ব্যবসায়ী মো. শাহাবুদ্দিন বর্তমানে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি করছেন ১ হাজার ৯৫০ টাকায়। তিনি বলেন, ‘আমরা কখনোই সরকারি মূল্যে সিলিন্ডার কিনতে পারি না। বেশিরভাগ সময় সরকারি রেটের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে আমাদের সিলিন্ডার কিনতে হয়। পাশাপাশি এর সঙ্গে আমাদের লেবার কস্ট (শ্রমিক খরচ) ও যাতায়াত ভাড়াও যোগ করতে হয়।’
আইডিয়াল এলপিজির স্বত্বাধিকারী মো. ইউসুফ বলেন, সরকার একটা রেট নির্ধারণ করে দিলেও কোম্পানিগুলো যে রেট দেয়, আমাদের সেই দামেই কিনতে হয়। ধরেন, সরকারি রেট ১ হাজার টাকা হলে আমাদের কিনতে হয় ১ হাজার ৫০ বা ১ হাজার ১০০ টাকায়। সেই টাকার সঙ্গে আমরা লোড-আনলোড ও কর্মচারীদের খরচ যোগ করি। ফলে ভোক্তাপর্যায়ে পৌঁছাতে প্রতি সিলিন্ডারে দাম এমনিতেই ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়ে যায়।
যোগাযোগ করা হলে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) ভাইস প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন রশীদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এলপিজির মূল্যের এই বিষয়টি নিয়ে আমরা মন্ত্রণালয়ে কথা বলেছি। সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রীও এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কোম্পানি থেকে ডিস্ট্রিবিউশন পর্যায়ে কম মূল্যেই এলপিজি সরবরাহ করা হয়। কিন্তু একটা দুষ্টচক্রের কারণে রিটেইলার (খুচরা) পর্যায়ে দামটা বেড়ে যায়। এ বিষয়ে গ্রাহকদের সচেতন হতে হবে এবং বিশেষ করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা উচিত।’

এদিকে, বাড়তি দামের এই খড়্গ সবসময়ই পোহাতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সিদ্দিকুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘গত কয়েক মাসে সিলিন্ডারের দাম শুধু বেড়েই চলেছে। সরকারি দামে তা কখনোই কিনতে পারিনি।’
শ্যামলীর বাসিন্দা মো. শাহাদাত বলেন, ‘সরকারিভাবেই তো দাম আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে। কিন্তু বাজারে এসে সেই দামেও সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। বাড়তি দামেই কিনতে হচ্ছে, যা আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের ওপর চরম আর্থিক চাপ তৈরি করছে।’
এই সংকটের সমাধান সম্পর্কে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন বলেন, ‘এলপিজির বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে বিইআরসিকে মাঠপর্যায়ে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে হবে। যেসব ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্ট অতিরিক্ত দামে খুচরা পর্যায়ে গ্যাস বিক্রি করে, তাদের চিহ্নিত করে ধরে ধরে জরিমানা করতে হবে। তাহলে এই অপপ্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে। পাশাপাশি কোম্পানিগুলোও যদি এর সঙ্গে যুক্ত থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধেও বিইআরসিকে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।’
খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, তারা নিজেরাই সরকারি রেটের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হন, যার সাথে লেবার কস্ট ও পরিবহন ভাড়া যুক্ত হয়ে দাম আরও বাড়ে। এই বাজার সংকট দূর করতে বিশেষজ্ঞরা মাঠপর্যায়ে বিইআরসি-র কঠোর নজরদারি ও অনিয়মকারী ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্টগুলোকে ধরে ধরে জরিমানার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে, বিইআরসি তদারকি জোরদার করার মাধ্যমে ভবিষ্যতে দাম নিয়ন্ত্রণে আনার আশ্বাস দিয়েছে

সার্বিক বিষয়ে বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘ভোক্তাপর্যায়ে এলপি গ্যাসের সঠিক দাম নিশ্চিত করতে বিইআরসি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আগের তুলনায় বাজারে বাড়তি দাম নেওয়ার প্রবণতা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। আশা করছি, নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে ভবিষ্যতে এটি আরও নিয়ন্ত্রণে আসবে।’
ওএফএ/এমএআর/
