বিজ্ঞাপন

ভাড়া বাড়ল, অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটও ‘বৈধ’ হল মেয়রের বৈঠকে

ভাড়া বাড়ল, অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটও ‘বৈধ’ হল মেয়রের বৈঠকে

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে রোগী ও মরদেহ পরিবহনে একটি প্রভাবশালী অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল, এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে সেবাখাতকে উন্মুক্ত করা হবে।

কিন্তু বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ ও তা নিয়ে আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত বৈঠকে উল্টো অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাইরের অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসায় ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, যে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখার অভিযোগ রয়েছে, সেই ব্যবস্থার সংস্কার বা ভাঙনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উল্টো ভাড়া বৃদ্ধি এবং বাইরের অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলে আন্দোলনের মুখে সিন্ডিকেটের কার্যক্রম সীমিত হওয়ার পরিবর্তে তা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। ভুক্তভোগীদের মতে, রোগী ও মরদেহ পরিবহনে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার পরিবর্তে বিদ্যমান কাঠামো বহাল রাখার সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এতে অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।

সোমবার (৮ জুন) চমেক হাসপাতালের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জরুরি মতবিনিময় সভায় অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া ৩০ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ও চমেক হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন। উপস্থিত ছিলেন অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির নেতারা এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রতিনিধিরা।

সভা শেষে জানানো হয়, অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির ৫০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিপরীতে ৩০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। নতুন তালিকায় ৫ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য সর্বনিম্ন ভাড়া ১ হাজার ১৪৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৩৪ কিলোমিটার দূরত্বের লোহাগাড়া উপজেলার জন্য ননএসি বড় অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ৫ হাজার ৪০০ টাকা এবং এসি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ৫ হাজার ৭৮৫ টাকা।

চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে মালিক সমিতির কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হবে। হাসপাতাল এলাকায় দৃশ্যমান স্থানে রেট চার্ট টাঙিয়ে দেওয়া হবে এবং কোনো চালক নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অর্থ নিতে পারবেন না। রোগী ও স্বজনদের হয়রানি রোধে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হবে।

চমেক অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না। তবে কারও নিজস্ব গাড়ি থাকলে তারা রোগী ও মরদেহ পরিবহন করতে পারবেন। সবকিছুর খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা আগের ভাড়ার ওপর ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছিলেন। তবে দীর্ঘ আলোচনার পর ৩০ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

 

এদিকে, রোগীর স্বজনদের মতে, এসব সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিনের অভিযোগে থাকা সিন্ডিকেট ব্যবস্থাকেই আরও শক্তিশালী করেছে। কারণ সাধারণ মানুষের প্রধান দাবি ছিল হাসপাতাল এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স সেবায় মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। যাতে যে কোনো বৈধ অ্যাম্বুলেন্স রোগী বা মরদেহ পরিবহনের জন্য প্রবেশ করতে পারে এবং স্বজনরা দরকষাকষির মাধ্যমে যুক্তিসঙ্গত ভাড়ায় সেবা নিতে পারেন।

রোগীর স্বজন মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, আমরা ভেবেছিলাম আন্দোলনের পর প্রশাসন সিন্ডিকেট ভাঙার উদ্যোগ নেবে। কিন্তু বৈঠকে যা হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে সিন্ডিকেটকে আরও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বাইরের অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে না পারলে প্রতিযোগিতা কোথায় থাকবে?

সম্প্রতি রোগী নিয়ে চমেকে যাওয়া চন্দনাইশ উপজেলা বাসিন্দা দিদারুল আলম বলেন, একজন মানুষ যখন মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরবে, তখন তার হাতে দরকষাকষির সুযোগ থাকে না। এই দুর্বল অবস্থার সুযোগ নিয়েই অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। আমরা ভেবেছিলাম পরিবর্তন আসবে, কিন্তু এখন তো ভাড়া আরও বাড়ানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, চমেক হাসপাতাল এলাকায় বহু বছর ধরে নির্দিষ্ট একটি বলয়ের বাইরে অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনা করা কঠিন। বাইরের অনেক চালক অভিযোগ করেন, হাসপাতাল থেকে রোগী বা মরদেহ পরিবহনের সুযোগ তারা পান না। সর্বশেষ বৈঠকে বাইরের অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করতে পারবে না বলে যে সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

আবার ভুক্তভোগীদের আরেকটি প্রশ্ন ভাড়া বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে। তাদের দাবি, অধিকাংশ অ্যাম্বুলেন্সই সিএনজিচালিত বা গ্যাসচালিত। অথচ তেলের দাম বৃদ্ধি ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি দেখিয়ে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। প্রকৃত ব্যয়ের কোনো স্বচ্ছ হিসাব জনসম্মুখে উপস্থাপন না করেই ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তাদের মতে, যদি সত্যিই সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিবেচনা করা হতো, তাহলে প্রথমে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা হতো। যে কোনো বৈধ অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতাল এলাকায় রোগী নিতে পারত। ভাড়া নির্ধারণে বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতা থাকত। কিন্তু বৈঠকের সিদ্ধান্তে সেই পথ বন্ধ করে দিয়ে বিদ্যমান কাঠামোকেই আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।

এর আগে রোববার বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সদস্যদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনের মূল দাবি ছিল কথিত সিন্ডিকেট ভেঙে রোগী ও মরদেহ পরিবহনে স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। কিন্তু আন্দোলনের ঠিক পরদিন অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্তে সেই দাবির প্রতিফলন না দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক রোগী ও স্বজন।

এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সদস্য সচিব আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, “মেয়র সিন্ডিকেট ভাঙলেন না, উল্টো সিন্ডিকেটের পক্ষ নিয়ে ভাড়া ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দিলেন। এখন চলছে জনগণের পকেট কাটার কর্মসূচি। দেশে তেলের দাম বেড়েছে, কিন্তু মেয়র গ্যাসচালিত অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছেন। যেন মৃত্যুর পরও মানুষের নিস্তার নেই। আপনার লাশের ওপরও সিন্ডিকেট করে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হবে। ৮০ শতাংশ অ্যাম্বুলেন্সের লাইসেন্স নেই, অনেকগুলোর ১০ বছর ধরে নবায়ন করা হয়নি, অথচ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সেগুলো চলছে। মাইক্রোবাস পরিবর্তন করে লাল-নীল বাতি লাগিয়ে অনেক যানবাহনকে অ্যাম্বুলেন্স বানানো হয়েছে।”

শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি এস এম লুৎফর রহমান বলেন, “চমেক হাসপাতালে বাইরের অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশে বাধা এবং ৩০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানাই। মেয়রের উপস্থিতিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অর্থ হলো অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের কার্যক্রমকে বৈধতা দেওয়া। একজন রোগী বা তার স্বজন যখন জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্সের প্রয়োজন অনুভব করেন, তখন তাদের প্রথম চিন্তা থাকে দ্রুত ও সাশ্রয়ীভাবে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। সেখানে প্রতিযোগিতা সীমিত করে বাইরের অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশে বাধা দেওয়া হলে সাধারণ মানুষের বিকল্প বেছে নেওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ন হয়।”

এমআর/

বিজ্ঞাপন