জলবায়ু সংকট এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি শ্রম, জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ— এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক নেতারা।
সোমবার (৮ জুন) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষ্যে ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশ (এনএজেটিবি) এবং সাসটেইনেবল ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড ইনভাইরনমেন্টাল পলিউশন (এসএমইপি) আয়োজিত ‘জলবায়ু সংকট ও কাজের ভবিষ্যৎ : টেকসই ও ন্যায্য বাংলাদেশের পথে যাত্রা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
এতে বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর রাইসুল ইসলাম খান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার ওপর সরাসরি আঘাত হানছে।
সংস্থাটির প্রোগ্রাম অফিসার মো. জুবায়ের আলম উপস্থাপনায় জানান, ২০২৪ সালে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায় এবং চলতি বছরও অনেক এলাকায় ৩৯ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করছে। তাপপ্রবাহ, বিদ্যুৎ সংকট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে শ্রমজীবী মানুষ চরম প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করছেন। এর ফলে পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ও কিডনি জটিলতার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। প্রতিবছর তাপজনিত কারণে প্রায় ২৫ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং প্রায় একশ ৭৮ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় শূন্য দশমিক চার শতাংশ।
শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আমিন বলেন, শিল্পনীতিতে উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও শ্রমিকদের জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ইন্ডাস্ট্রিঅলের বাংলাদেশ কাউন্সিলের চেয়ারপার্সন কুতুবউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রকৃতির বিরুদ্ধে গেলে তার ফল ভোগ করতেই হবে।
জলবায়ু ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক কাঠামোতে মুনাফাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এখন টেকসই উন্নয়ন আর বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজন।
অন্যদিকে, জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপের আহ্বান জানান ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়ক সোহানুর রহমান।
বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির কল্পনা আক্তার বলেন, বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’র কথা বললেও শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করছে না। অন্যদিকে জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে এনএজেটিবির নির্বাহী সমন্বয়ক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট ও সংকটকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা, জলবায়ু-সহনশীল আবাসন এবং নিরাপদ গণপরিবহনকে যৌথ দরকষাকষি চুক্তির অংশ করতে হবে।
আলোচনায় বক্তারা কর্মক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক তাপ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, নগর সবুজায়ন, জলাধার পুনরুদ্ধার, জলবায়ু-সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্য সচেতনতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন ও মানবাধিকার চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। সমন্বিত নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশ জলবায়ু-সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বৈশ্বিক উদাহরণ হতে পারে।
এমএইচএন/জেআই/জেডএস
