বিজ্ঞাপন

জনগণ আন্দোলনে জীবন দেয়, কিন্তু সুফল পৌঁছায় না : হাসনাত কাইয়ুম

জনগণ আন্দোলনে জীবন দেয়, কিন্তু সুফল পৌঁছায় না : হাসনাত কাইয়ুম

গত কয়েক বছরে আমরা অনেক আলোচনা, বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে গেছি বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুম। তিনি বলেছেন, কিন্তু অনেক কিছু করতে পারিনি, অনেককে যুক্ত করতে পারিনি, অনেক ক্ষেত্রে আপসও করতে হয়েছে। কিন্তু তারপরও আমাদের একটি লক্ষ্য ছিল যাতে জনগণের আত্মত্যাগ আবারও ব্যর্থ না হয়।

তিনি বলেন, আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, আন্দোলন ও সংগ্রামে জনগণ জীবন দেয়, রক্ত দেয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার সুফল অনেক সময় জনগণের হাতে পৌঁছায় না। সেই চক্র ভাঙার একটি সচেতন চেষ্টা ছিল আমাদের। আমরা চেয়েছিলাম এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে, যেখানে পরিবর্তনের জন্য বারবার রক্ত দিতে না হয়।

মঙ্গলবার (৯ জুন) জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি আয়োজিত 'রাজনৈতিক তাত্ত্বিক সিরাজুল আলম খানের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে গণভোট, রাষ্ট্র সংস্কার ও সিরাজুল আলম খানের প্রাসঙ্গিকতা' শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।

হাসনাত কাইয়ূম বলেন, এই চিন্তা থেকেই আমরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের ধারণা সামনে এনেছিলাম। আমাদের প্রস্তাব ছিল, ভবিষ্যতে সংবিধান পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে, তা যেন আর অভ্যুত্থান, সংঘর্ষ বা রক্তপাতের মাধ্যমে না হয়। জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সংস্কার পরিষদ গঠন করবে, আর সেই পরিষদ জনগণের ম্যান্ডেট অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করবে।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এই প্রস্তাবটি রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। যারা বিকল্প রাজনৈতিক ধারার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারতেন, তাদের অনেকেই পরে ক্ষমতার অংশ হয়ে গেলেন। ফলে, যে ঐতিহাসিক সুযোগটি তৈরি হয়েছিল, তা পূর্ণতা পায়নি। বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা বারবার দেখেছি, জনগণের সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত জনগণের হাতছাড়া হয়ে গেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর, ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলনের পর, এমনকি সাম্প্রতিক সময়েও এই অভিজ্ঞতা দেখা গেছে। মানুষ যাদের নেতা বানায়, যাদের জন্য জীবন দেয়, অনেক সময় তারাই পরে জনগণের প্রতিনিধিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক বলেন, সিরাজুল আলম খান ১৯৭২ সালে ‘একজন দেবতার পতন’ বলেছিলেন। আমার কাছে এই কথার অর্থ হলো— জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিরা যখন জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন তারা আর জনগণের নেতা থাকে না। এই বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়েই এক ধরনের রাজনৈতিক দানবায়ন শুরু হয়। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রবণতা বারবার দেখা গেছে। জনগণ আত্মত্যাগ করেছে, কিন্তু সেই আত্মত্যাগের ফসল শেষ পর্যন্ত অন্যরা ভোগ করেছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে, কেন বারবার আমাদের বিজয় বেহাত হয়ে যায়?

তিনি ধারণা করে বলেন, এর একটি কারণ হলো আমরা আন্দোলনের সময় শুধু জয়ের কথা ভাবি। কিন্তু কারা সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান কী, তারা জনগণের স্বার্থের পক্ষে নাকি বিপক্ষে— এসব প্রশ্নকে গুরুত্ব দিই না। আমরা প্রায়ই মনে করি, আগে জিততে হবে, পরে অন্য হিসাব করা যাবে। ফলে আন্দোলনের ভেতরে দালাল, সুবিধাবাদী কিংবা জনগণের স্বার্থবিরোধী শক্তিও জায়গা পেয়ে যায়। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে, পরে তারাই সংগ্রামের অর্জনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতের লড়াইয়ের জন্য আমাদের নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। শুধু কীভাবে জিতব, সেই প্রশ্ন নয় বরং কারা এই লড়াইয়ে থাকবে, কারা জনগণের পক্ষে থাকবে এবং কারা জনগণের সংগ্রামকে ব্যবহার করতে চায়— সেই প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে যদি সত্যিই সঠিক পথে এগিয়ে নিতে হয়, তাহলে আমাদের এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে। রাজনৈতিক দল, নেতৃত্ব এবং জনগণের মধ্যে জবাবদিহি ও মালিকানার সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হবে। অন্যথায়, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি তানিয়া রবের সভাপতিত্বে অন্যান্যরা এতে বক্তব্য রাখেন।

এমএইচএন/জেআই/জেডএস

বিজ্ঞাপন