দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে চরম অব্যবস্থাপনা চলছে অভিযোগ করে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেছেন, ৮৯ কোটি টাকার একজন ঋণখেলাপি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হয়েছেন। অন্যদিকে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ায় সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন আমানতকারীরা।
মঙ্গলবার (৯ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (বাজেট) অধিবেশনে ৬৮ বিধিতে এক সাধারণ আলোচনার ওপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সংসদে ‘দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং কোটি কোটি গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শেয়ারসমূহ বৈধ ও প্রকৃত মালিকদের কাছে প্রত্যর্পণ এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় অন্যায় হস্তক্ষেপ বন্ধ’ করার দাবিতে এ আলোচনার প্রস্তাব করেন বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, বর্তমানে ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০টি প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের আমানতের টাকা সময়মতো ফেরত দিতে পারছে না। ১৪টি ইসলামী ব্যাংকও গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। এর ফলে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। যার কারণে গত কয়েকদিনে ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা।
আর্থিক খাতে জালিয়াতির ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, এদেশে রিজার্ভ চুরির মতো বড় ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ডিজিএফআইয়ের নেতৃত্বে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে। এস আলম গ্রুপের কারণে ইসলামী ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। সাইপ্রাসের মতো দেশ এস আলমের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে।
খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান তুলে ধরে এই সংসদ সদস্য বলেন, ২০০৯ সালে ব্যাংক খাতে সার্বিক খেলাপি ঋণের হার ছিল ৯.২ শতাংশ, ২০২৬ সালে তা ৩২.২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০০৯ সালে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২-৩ শতাংশ। কিন্তু বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম জোরপূর্বক ব্যাংকটি দখল করার পর সেখানে খেলাপি ঋণ ৭৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। বড় ঋণখেলাপির শীর্ষে আছে এস আলম।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমালোচনা করে মিলন বলেন, ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা আজ চরম বিতর্কিত। একজন ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, যার কাছে ব্যাংক ৮৯ কোটি টাকা পাবে, তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বানানো হয়েছে। একসময় এদেশের ডলারের রেট ছিল ৮৪ টাকা, আজ তা ১২৬ টাকায় চলে গেছে। দেশ চালাতে আমাদের আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা এসঅ্যান্ডপি, মুডিজ এবং ফিচ-এর রেটিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ২০০৯ সালের ‘পজিটিভ/স্ট্যাবল’ থেকে ২০২৬ সালে ‘বি প্লাস’ বা ‘নেগেটিভে’ নেমে এসেছে। রেটিং পজিটিভ না হলে আমরা বিদেশি ঋণ পাব না।
ব্যাংক একীভূতকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড হলো কোনো ব্যাংক একীভূত করার আগে অ্যাসেট ভ্যালুয়েশন (সম্পদ মূল্যায়ন) করা। কিন্তু সেটা না করেই দেশে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে দেওয়া হয়েছে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক বারবার বলছে খেলাপি ঋণের প্রকৃত রূপ প্রকাশ করতে এবং উইন্ডো ড্রেসিং (হিসাবের কারচুপি) বন্ধ করতে। কিন্তু সরকারি ব্যাংকগুলোও উইন্ডো ড্রেসিং করে রিপোর্ট প্রকাশ করছে।
ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরাতে কয়েকটি প্রস্তাব দেন সাইফুল আলম খান মিলন। এর মধ্যে রয়েছে—ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন, ভালো গ্রাহকদের প্রণোদনা দেওয়া, উইন্ডো ড্রেসিং বন্ধ করা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পর্ষদ গঠন, ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে শুধু কর্মকর্তাদের নয়, পরিচালকদেরও সরাসরি জবাবদিহির আওতায় আনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি করা এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন।
ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক ট্যাগ দেওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বলা হয় ইসলামী ব্যাংককে রাজনীতিমুক্ত করতে হবে। এটি কেন বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যাংক হবে? আবদুল আউয়াল মিন্টু সাহেব একটি ব্যাংকের কর্ণধার, আমরা কি সেটাকে বিএনপির ব্যাংক বলব? মির্জা আব্বাস ঢাকা ব্যাংকের ডিরেক্টর, সেটা কি বিএনপির ব্যাংক? কিংবা প্রয়াত আবদুল জলিল সাহেব যে ব্যাংকের ডিরেক্টর ছিলেন, সেটাকে কি আমরা আওয়ামী লীগের ব্যাংক বলব?
এমএসআই/এসএম
