বিজ্ঞাপন

‘আপনি নিরপেক্ষতা হারিয়েছেন’, সংসদে স্পিকারকে বিরোধীদলীয় উপনেতা

‘আপনি নিরপেক্ষতা হারিয়েছেন’, সংসদে স্পিকারকে বিরোধীদলীয় উপনেতা

জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সরকারি ও বিরোধী দলের বক্তব্যের ক্রম এবং সময় নির্ধারণকে কেন্দ্র করে স্পিকার ও বিরোধীদলীয় উপনেতার মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ ও অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছে। পূর্বনির্ধারিত নামের তালিকায় আকস্মিক পরিবর্তনের অভিযোগ এনে স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দলের উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ আবু তাহের। একপর্যায়ে তিনি ক্ষোভে বক্তব্য বর্জন করারও ঘোষণা দেন।

অন্যদিকে, সংসদীয় রীতিনীতি ও উভয় পক্ষের চিফ হুইপদের বিশেষ অধিকারের বিষয়টি স্পষ্ট করে স্পিকার পরিস্থিতি শান্ত করেন এবং ছোটোখাটো কার্যপ্রণালীগত বিতর্ক এড়িয়ে দেশের চলমান ব্যাংকিং খাতের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ মূল আলোচনায় নিবিড় মনোযোগ দেওয়ার জন্য সংসদকে তাগিদ দেন।

মঙ্গলবার (৯ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ৬৮ বিধিতে আলোচনার সময় স্পিকার ও বিরোধীদলীয় উপনেতার মধ্যে এমন পাল্টাপাল্টি আলোচনা হয়। এ সময় অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সভাপতিত্ব করেন।

সংসদে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সরকারি দলের আসন থেকে জানানো হয়, অর্থমন্ত্রী এখন বলবেন না, অর্থমন্ত্রী বলবেন সবার শেষে। হি ইজ দ্য লাস্ট বক্তা, উনি পুরো বিষয়টি সাম আপ (উপসংহার) করবেন। এরপর স্পিকার পরবর্তী বক্তা হিসেবে বিরোধী দলের উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নাম ঘোষণা করেন এবং তার জন্য সাত মিনিট সময় নির্ধারণ করে দেন।

অসুস্থতার কারণে স্পিকার তাকে বসে বলার অনুমতি দিলে বিরোধী দলের উপনেতা মাইক পেয়ে নিজের তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। মাননীয় স্পিকার, আপনি তো এই সংসদের জন্য একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি। কিন্তু আনফরচুনেটলি (দুর্ভাগ্যবশত) একটু আগে যে সিচুয়েশনটা ক্রিয়েট (পরিস্থিতি তৈরি) হয়েছে, সেটা খুবই আনফরচুনেট। কারণ স্পিকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়ার পরে, সিট থেকে দাঁড়িয়ে আবার নতুন করে ডিজাইন ও পরিবর্তন করা অসম্ভব একটা বিষয়। এর প্রতিবাদে আমি আজকে কোনো বক্তব্য রাখব না, ধন্যবাদ।

বিরোধী দলের উপনেতার এমন বক্তব্যের পর স্পিকার সংসদীয় রীতিনীতি ব্যাখ্যা করে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। স্পিকার বলেন, মাননীয় বিরোধী দলের উপনেতা, বক্তব্য রাখা বা না রাখার ইচ্ছা-অনিচ্ছা সেটা আপনার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু সাধারণত প্র্যাকটিস (রেওয়াজ) হলো, যদি সরকারি দলের নেতারা বক্তব্য দেন, সেখানে চিফ হুইপ নাম উপরে-নিচে করতে পারেন কিছু। আবার বিরোধী দলের তরফ থেকেও যখন কথাবার্তা বলবেন, বিরোধী দলের চিফ হুইপও বক্তাকে উপরে-নিচে দিতে পারেন। এখন আপনি যদি না বলেন, মাননীয় বিরোধী দলের নেতা, আপনি কি উনার পরিবর্তে অন্য কাউকে দিতে বলবেন? আপনাদের ৩০ মিনিট সময় আছে, আপনারা বক্তব্য রাখতে পারবেন। মাইক দেন, বিরোধী দলের উপনেতাকে মাইক দেন।

এরপর পুনরায় মাইক পেয়ে বিরোধী দলের উপনেতা স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন। তিনি স্পিকারের উদ্দেশ্যে বলেন, এই চেয়ারটা মাননীয় স্পিকারের। আসলে এখানে আমাদের যে সিরিয়ালটা দেওয়া হয়েছে এবং আপনি যেটা করেছেন, এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি কিন্তু আপনার। বাকিরা বলতে পারে, আপত্তি করতে পারে। এখানে যদি কোনো কিছুই ঘোষণা না হতো এবং এরপরে আপনি আমাকে সময় দিতেন বা এরপরে মাননীয় নেতাকে সময় দিতেন, তাতে কোনো আপত্তি ছিল না। কারণ আমাদের দিক থেকে তিনজন বক্তব্য রাখার পরে, আপনি সরকারের পক্ষ থেকে একজনকেও বক্তব্য দিতে দেবেন না, এটা তো ঠিক না। তারা বক্তব্য দিলে আমরা তাদের মাইন্ড (মনোভাব) বুঝতে পারতাম, তারা কী করতে চাচ্ছে। যেহেতু একটা আনপ্লিজেন্ট এনভায়রনমেন্ট (অপ্রীতিকর পরিবেশ) এখানে তৈরি হয়েছে এবং সেটা আপনি অ্যালাউ (অনুমতি) করেছেন; আপনি এটা অ্যালাউ করে আপনার নিরপেক্ষতা হারিয়েছেন।

বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় বিরোধী দলের উপনেতা ভারতের পার্লামেন্টের একটি উদাহরণ টেনে স্পিকারের ভূমিকা ও স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, আমি আপনাকে ভারতের পার্লামেন্টের একটি আলোচনার উদাহরণ দিতে চাই। পার্লামেন্টে ঢোকার সময়ে স্পিকারও ছিলেন, তারপর সেখানে কংগ্রেসের যিনি প্রধান তিনি ছিলেন এবং বর্তমান প্রাইম মিনিস্টার (প্রধানমন্ত্রী) যিনি, তিনিও ছিলেন। তো প্রাইম মিনিস্টার যখন এসেছেন, তখন স্পিকার তাকে একটু অধিকতর সম্মান দেখিয়ে ট্রিটমেন্ট (আচরণ) দিয়েছেন এবং তার প্রতিবাদে সেখানে রাহুল গান্ধী দাঁড়িয়ে স্পিকারের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনেছিলেন; স্পিকার সেটাকে পরে এন্ডোর্স (স্বীকার) করেছেন। এটা হচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড অব পার্লামেন্ট অ্যান্ড রোল অব স্পিকার (সংসদের মানদণ্ড ও স্পিকারের ভূমিকা)। কিন্তু আজকে সেটার ব্যত্যয় ঘটে গেছে। এটা আপনাকে ব্যাখ্যা করতে হবে যে, একজনের নাম ঘোষণার পরে উনি সেটাকে চেঞ্জ (পরিবর্তন) করে আবার অপজিশনের (বিরোধী দলের) একজন বক্তাকে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন, এটার কারণটা কী, এটা আমরা একটু জানতে চাই।

বিরোধী দলের উপনেতার এই গুরুতর অভিযোগের জবাবে স্পিকার অত্যন্ত ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন এবং সংসদীয় বিধি মনে করিয়ে দেন। স্পিকার বলেন, মাননীয় বিরোধী দলের উপনেতা, সংসদের বক্তাদের ক্রম নির্ধারণ করে স্পিকার, স্পিকারের সেই অথরিটি (কর্তৃত্ব) আছে। তারপরও এখানে তেমন কোনো খারাপ পরিবেশ তো আমি দেখতে পাচ্ছি না। আমি তো উভয় দলের মধ্যে সহযোগিতার পরিবেশ এখনো দেখতে পাচ্ছি। তারা তাদের আধা ঘণ্টা সময়ের মধ্যে টাইমটা নির্ধারণ করেছে। সংসদের গুরুত্বপূর্ণ দুজন ব্যক্তি হলেন সংসদ নেতা এবং বিরোধী দলের নেতা; তাদের যে সিরিয়াল, এটা ব্রেক (ভঙ্গ) করা হয় না। তার মধ্যে যদি আপনি মনে করেন যে উপনেতাকে একটু সুযোগ দেওয়া হয় নাই বা কিছু, সেটা আপনি ভাবতে পারেন, কিন্তু এটাতে সিরিয়ালে কোনো ব্যত্যয় ঘটানো হয়নি। দ্বিতীয়ত, ভারতের যে উদাহরণ আপনি দিলেন, সংসদ নেতার অনেক প্রিভিলেজ (বিশেষাধিকার) থাকে। সুতরাং প্রাইম মিনিস্টারকে যদি একটু টাইম বেশি দিয়ে থাকেন স্পিকার, তিনি সংসদ নেতাকে দিয়েছেন, প্রাইম মিনিস্টারকে দেন নাই, সংসদ নেতা হিসেবে দিয়েছেন। সুতরাং কিছু এমন হতেই পারে।

স্পিকার আরও যোগ করে বলেন, যাই হোক, এটা অত্যন্ত তুচ্ছ বিষয়। আপনারা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে। এখানে আমার মনে হয়, আমার ব্যক্তিগত মত, এই ছোটোখাটো বিষয় উপেক্ষা করে মূল বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে এটার ওপরেই যদি আপনারা মনোযোগ অধিকতর নিবদ্ধ করেন, তবে জাতি উপকৃত হবে। ধন্যবাদ, প্লিজ গো অ্যাহেড (শুরু করুন)।

স্পিকারের এই আন্তরিক অনুরোধ ও ব্যাখ্যার পর বিরোধী দলের উপনেতা পুনরায় কথা বলতে রাজি হন, তবে তার মানসিক অবস্থা পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “জি মাননীয় স্পিকার, আপনি যেহেতু পরে আবার অনুরোধ করেছেন, আমি আপনার অনুরোধ রক্ষা করব। তবে আলোচনা করার যে মুড (মানসিকতা) আমার ছিল, ফ্রাঙ্কলি স্পিকিং (সত্যি বলতে), আই লস্ট ইট (আমি তা হারিয়েছি)।

এসআর/এসএএস/এসএম