ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-র মালিকানা নিয়ে চলমান সংকটের স্থায়ী সমাধানে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। জাতীয় সংসদে দেওয়া এক বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট জানিয়েছেন, ব্যাংকটির শেয়ারগুলো প্রকৃত ও বৈধ মালিকদের হাতে ফিরিয়ে দিতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া করা হবে।
একইসঙ্গে দেশের ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী যেকোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল কিংবা চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অপসারণে বাংলাদেশ ব্যাংক তার পূর্ণ রেগুলেটরি ক্ষমতা প্রয়োগ করবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
মঙ্গলবার (৯ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ৬৮ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সভাপতিত্ব করেন।
শেয়ার হোল্ডিং ও মালিকানা হস্তান্তর প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ইবনে সিনার মাত্র ২ শতাংশ শেয়ার ব্লক মার্কেটে তিন গুণ বেশি দামে বিক্রি করার রেকর্ড রয়েছে। বর্তমানে একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের কাছে ব্যাংকের প্রায় ৮১ থেকে ৯২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে বলে পরিসংখ্যানের বরাতে উল্লেখ করেন তিনি।
বিরোধীদলীয় নেতার নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং কোটি কোটি গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারগুলো প্রকৃত ও বৈধ মালিকদের নিকট ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে কোন শেয়ারহোল্ডার কীভাবে এই শেয়ার খরিদ করেছেন, তা খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা আইনি তদন্তের ওপর জোর দেন তিনি।
ইসলামী ব্যাংকের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প 'পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প' বা আরডিএস-এর আওতায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এই প্রকল্পে এ পর্যন্ত প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে। নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য নারীদের মাঝে ১০ হাজার টাকা করে বিতরণ করে ‘কোরআনের দল’ হিসেবে ভোট চাওয়ার রাজনৈতিক প্রচারণারও সমালোচনা করেন তিনি। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের কোনো সঠিক হদিস নেই এবং এর সুষ্ঠু তদন্ত করে টাকা ফেরত আনার ব্যবস্থা করা হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট কিছু গ্রুপের ঋণ অনিয়মের খতিয়ান তুলে ধরে বলেন, নাবিল গ্রুপ ৭০০ কোটি টাকা এলসির বিপরীতে লোন নিয়েও মালামাল বিক্রি করে ব্যাংকের টাকা ফেরত দেয়নি। এই গ্রুপটি ১৬ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক লায়াবিলিটি থাকা সত্ত্বেও একটি টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজ করছে। পাশাপাশি লান্তাবোর গ্রুপকে প্রধান কার্যালয়ের কোনো অনুমোদন ছাড়াই নির্বাচনের আগে ৪০ কোটি টাকা লোন দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে সামাজিক দায়বদ্ধতা খাতের বা সিএসআর ফান্ডের অর্থ দিয়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিমানের টিকিট কাটার মতো অনিয়ম সংগঠিত হয়েছে, যা সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।
ব্যাংকটির প্রশাসনিক অনিয়ম উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, ব্যাংকটি জোরপূর্বক দখলের পর নিয়মবহির্ভূতভাবে ৯ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, যারা বর্তমানে রাস্তায় আন্দোলন করছেন। এর বিপরীতে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের ৬ হাজার নতুন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং নিয়ম ভেঙে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই থেকে তিনটি পর্যন্ত প্রমোশন দিয়ে মোট ১৩ হাজার কর্মীকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেআইনি চাকুরিচ্যুতির শিকার কর্মীদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় হওয়া নিয়োগগুলোর বৈধতা তদন্তের দাবি জানান।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের সেকশন ৪৫, ৪৬, ৪৭ এবং ৫৭(এ)-এর কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, জনস্বার্থে, মুদ্রানীতি ও ব্যাংক নীতি রক্ষার্থে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্নকারী যেকোনো কার্যক্রম প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ দিকনির্দেশনা দেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলে যেকোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল এবং চেয়ারম্যানসহ বোর্ড অব ডিরেক্টরসদের অপসারণ করতে পারে। রেগুলেটরি অথরিটি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের স্বার্থে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করবে।
ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আনা মৌখিক ও সংবাদমাধ্যমের অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, 'প্রিজাম্পশন অব ইনোসেন্স' বা অপরাধী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ নীতি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো অভিযোগ বা তদন্ত প্রমাণিত হয়নি, তবে নতুন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে তা তদন্ত করা হবে।
একই সঙ্গে, ব্যাংকে জোরপূর্বক কলম বিরতি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে বাধা দেওয়ার সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে এই সংক্রান্ত অডিও ও ভিডিও ফুটেজসহ সব প্রমাণ সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি হুশিয়ারি দেন যে, পর্দার আড়ালে থেকে গ্রাহকদের উসকানি দিয়ে আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা সফল হতে দেওয়া হবে না। এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে ওঠা লক্ষ কোটি টাকা পাচারসহ বিগত সময়ে দেশ থেকে হওয়া সমস্ত অর্থপাচারের ঘটনা বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে কঠোরভাবে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এসআর/বিআরইউ
