চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন জেলার পটিয়ার বিএনপি নেতা মোহাম্মদ কাইছ (৪০)। কারাগারে থাকা অবস্থাতেই ঢাকার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে এক ছাত্র হত্যা মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে! এমনকি, বিএনপির প্রার্থী হয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচন করা কাইছকে মামলায় উপস্থাপন করা হয়েছে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সম্পাদক হিসেবে! আন্দোলনের সময় তিনি সরাসরি প্রকাশ্যে গুলি চালিয়েছেন— এমন অভিযোগ তুলে সম্প্রতি তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার (শ্যোন অ্যারেস্ট) দেখানো হয়েছে।
এই ঘটনা চট্টগ্রামে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে আইনজীবী মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, তীব্র সমালোচনা হচ্ছে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও।
আদালত ও কারাগার সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাধিক মামলায় ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর গ্রেপ্তার হন বিএনপি নেতা কাইছ। এরপর থেকে তিনি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারেই বন্দি ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই যখন ঢাকার উত্তরা পূর্ব থানা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গুলিতে ছাত্র জাহিদুজ্জামান তানভীন নিহত হন, কাইছ তখনও কারাগারে। এর প্রায় ১ মাস ২৩ দিন পর, ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিন পান।
চট্টগ্রামে ২০২২ সাল থেকে কারাবন্দি পটিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ কাইছকে ঢাকার উত্তরা পূর্ব থানার একটি ছাত্র হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়ে তাকে ‘আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সম্পাদক’ হিসেবে মামলায় উপস্থাপন করা হয়েছে। ঘটনার সময় তিনি চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দি থাকলেও তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে গুলি চালানোর অদ্ভুত অভিযোগ এনেছে পুলিশ
জানা গেছে, কাইছ জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়ার কল্পলোক আবাসিক এলাকা থেকে সেনাবাহিনী কর্তৃক আবারও আটক হন এবং পরে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি তিনি অন্যান্য মামলায় জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বের হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে, রাজধানীর উত্তরার ওই হত্যা মামলায় তাকে ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ দেখানো হয়।
আদালতে তদন্ত কর্মকর্তার আজব আবেদন!
রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানার জাহিদুজ্জামান তানভীন হত্যা মামলায় কাইছকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর জন্য আদালতে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মাহবুবুল আলম খান। গত ১৬ মে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে করা ওই আবেদনে বলা হয়, ‘মো. কাইছ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সম্পাদক। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই উত্তরা পূর্ব থানার ৪ নম্বর সেক্টরের নওয়াব হাবিবুল্লাহ বাহার স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে ছাত্রদের ওপর গুলি করেন কাইছসহ এজাহারনামীয় আসামিরা। এতে জাহিদুজ্জামান তানভীনের মৃত্যু হয়।’

তদন্ত কর্মকর্তা আবেদনে আরও দাবি করেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে কাইছ তার কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়েছেন বলে ‘প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ’ পাওয়া গেছে! অথচ বাস্তব চিত্র হলো, এই ঘটনার দীর্ঘ দেড় বছর আগে থেকেই কাইছ চট্টগ্রামে কারাবন্দি ছিলেন।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ঢাকার উত্তরায় ছাত্র নিহতের ঘটনার সময় আসামি চট্টগ্রাম কারাগারে থাকলেও তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে দাবি করেছেন, কাইছের প্রকাশ্যে গুলি চালানোর প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে। জেলে থাকা ব্যক্তিকে এভাবে ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ দেখানোয় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আইনজীবী ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে এবং পুরো তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে
মোহাম্মদ কাইছ পটিয়া উপজেলার কাশিয়াইশ ইউনিয়নের বুধপুরা এলাকার বাসিন্দা এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য। বর্তমানে তাকে ঢাকার কেরানীগঞ্জ কারাগারে রাখা হয়েছে।
দায় এড়ালেন তদন্ত কর্মকর্তা ও ওসি
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও উত্তরা পূর্ব থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাহবুবুল আলম খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে তার নাম এসেছে, তাই গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে।’
ঘটনার দিন আসামি চট্টগ্রাম কারাগারে থাকার পরও ঢাকায় এসে প্রকাশ্যে গুলি করার তথ্য আদালতে কেন উপস্থাপন করা হলো— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা (আসামিপক্ষ) আদালতে বলেছে যে আসামি ঘটনার দিন কারাগারে ছিল। তিনি কারাগারে ছিলেন কি না, সেটি নিয়ে তদন্ত হচ্ছে।’ এই কথা বলেই তিনি ফোনের সংযোগ কেটে দেন। পরবর্তীতে উত্তরা পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোরশেদ আলমও ‘তদন্ত চলছে’ বলেই মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
ক্ষুব্ধ পরিবার ও রাজনৈতিক মহল
স্থানীয় বিএনপি নেতারা বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয় সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়ে একজন চেনা বিএনপি নেতাকে আওয়ামী লীগের নেতা বানিয়ে হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে। এটি শুধু একজন ব্যক্তির প্রতি অন্যায় নয়, বরং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মতো সংবেদনশীল মামলার পুরো তদন্ত প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।
কাইছের পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, তাকে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে। চট্টগ্রামে ভিন্ন মামলায় কারাগারে থাকা অবস্থায় তাকে ঢাকার ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতা বানিয়ে আসামি করা চরম হাস্যকর। তারা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানান।

আইনজীবীরা যা বলছেন
আইনজীবীরা মনে করছেন, কোনো মামলায় নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। তবে, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়, অবস্থান ও ঘটনার সময়কাল নিয়ে যখন এমন গুরুতর অসঙ্গতি দেখা দেয়, তখন তদন্ত কর্মকর্তার সেটি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা উচিত ছিল।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ ইউনুচ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘শ্যোন অ্যারেস্ট আবেদনের আগে তদন্ত কর্মকর্তার উচিত ছিল আসামির বাস্তব সম্পৃক্ততা যাচাই করা। জেলে থাকা ব্যক্তিকে এভাবে আসামি করা স্পষ্টত দায়িত্বের অবহেলা। অন্য কারও প্ররোচনায় অথবা অসৎ উদ্দেশ্যে তিনি এই ধরনের কাজ করে থাকতে পারেন।’
তিনি আরও বলেন, যদি কারা রেকর্ডে প্রমাণিত হয় যে অভিযুক্ত ব্যক্তি ঘটনার সময় জেলেই ছিলেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে ‘প্রকাশ্যে সরাসরি গুলি করার’ অভিযোগের ভিত্তি কী ছিল— সেটির ব্যাখ্যা তদন্ত কর্মকর্তাকেই দিতে হবে। তদন্তে ভুল, বিভ্রান্তিকর তথ্য বা তথ্য যাচাইয়ে এমন গাফিলতির প্রমাণ মিললে সেটি আইনিভাবে একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আরএমএন/এমএআর/
