দেশের বিমানবন্দরগুলোতে প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান, প্রটোকল ও অগ্রাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরের গুরুত্ব তুলে ধরে জাতীয় সংসদে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ।
বুধবার (১০ জুন) রাতে স্পিকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে কার্যপ্রণালী বিধির ১৪৭ বিধিতে বিরোধীদলীয় নেতার আনা প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্যে দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের ঐতিহাসিক অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের পাসপোর্ট সেবা নিশ্চিতকরণ, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রবাসীদের লড়াই, দক্ষ জনশক্তি তৈরির নতুন শিক্ষা পরিকল্পনা এবং নিজের গাড়ি ব্যবহার নিয়ে অতীতে তৈরি হওয়া একটি পুরোনো বিতর্কের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন।
প্রবাসীদের মর্যাদা রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের দেশের বিমানবন্দরসহ সর্বক্ষেত্রে যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মান ও অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র, শ্রম, প্রবাসী কল্যাণ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে একটি যৌথ ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করার বিষয়ে সরকার দ্রুত ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আরও উন্মুক্ত, নিরাপদ ও গতিশীল করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন রাষ্ট্রীয় সফরের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টিতে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়েছেন এবং তারই ধারাবাহিকতায় এবার মালয়েশিয়া সরকারের আমন্ত্রণে তিনি সেখানে যাচ্ছেন। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে এই খাতকে যারা তথাকথিত আদম ব্যবসা, মানব পাচার ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে কলঙ্কিত করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে এবং ইতিমধ্যে ১০০ জন প্রভাবশালী অপরাধীর বিরুদ্ধে আদালতে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।
শ্রমবাজারের নানাবিধ জটিলতা ও সমস্যা নিরসনে বিরোধীদলীয় নেতার টাস্ক ফোর্স গঠনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় চাইলে এই প্রস্তাবটি সম্পূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কার্যকর টাস্ক ফোর্স গঠন করতে পারে। তবে তার আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিষয়গুলো দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে অত্যন্ত কম সময়ে নিষ্পত্তি করা সম্ভব।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের বৈশ্বিক পাসপোর্ট সেবা আরও সহজ ও আধুনিকীকরণের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেওয়া বিভিন্ন যুগান্তকারী পদক্ষেপের কথা সংসদে বিশদভাবে তুলে ধরেন মন্ত্রী।
তিনি জানান, বিশ্বের ৭৩টি বাংলাদেশ মিশনের মধ্যে ইতিমধ্যে ৭১টিতে সম্পূর্ণ আধুনিক ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম চালু করা হয়েছে এবং বিগত ছয় মাসে প্রবাসে ইস্যুকৃত মোট পাসপোর্টের প্রায় ৮৬ শতাংশই ই-পাসপোর্ট। দেশের বাইরে অবস্থানরত বয়স্ক নাগরিকরা জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকলেও শুধুমাত্র ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন সনদের মাধ্যমে তথ্য সংশোধন ও পাসপোর্টের আবেদন করার বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন। সরকার ইতিমধ্যে পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যতিরেকে দ্রুত পাসপোর্ট ইস্যু, অনলাইন পেমেন্ট, এসএমএস ট্র্যাকিং এবং প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার জন্য মোবাইল এনরোলমেন্ট কিটের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দেওয়ার প্রক্রিয়া চালু করেছে। বায়োমেট্রিকে ১০ আঙ্গুলের ছাপ ও আইরিশ স্ক্যান নেওয়ার কারণে পাসপোর্ট জালিয়াতি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রবাসে পাসপোর্ট পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরসহ কিছু দেশে আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতার কারণে প্রবাসীদের যে বহুমাত্রিক ভৌগোলিক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তা নিরসনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে।
বিদেশে রাজতন্ত্র ও কঠোর আইনের মধ্যেও প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ফ্যাসিবাদ বিরোধী ঐতিহাসিক আন্দোলনের ভূয়সী প্রশংসা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি প্রবাসীরা দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার টানে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন করেছেন এবং অনেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মতো কঠিন সাজা ভোগ করছেন। বর্তমান অন্তর্র্বতীকালীন সরকার ইতিমধ্যে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক উদ্যোগে তাদের অনেকের মুক্তি নিশ্চিত করে স্বদেশে ফিরিয়ে এনেছে এবং বাকিদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রবাসীদের এই বিশাল শ্রমবাজারের সূচনা এবং গার্মেন্টস শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতির মজুত ও টেকসই ভিত্তি স্থাপনের জন্য তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী অবদানের কথা অকুন্ঠ চিত্তে স্মরণ করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কঠোর ‘স্ট্যান্ডিং অর্ডার’ বহাল রয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো প্রবাসীর মৃত্যুর খবর পাওয়ামাত্রই দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে লাশ দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়। তবে লিবিয়া হয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে ইতালি যাওয়ার পথে আন্তর্জাতিক দালের খপ্পরে পড়ে বাংলাদেশি যুবকদের ভূমধ্যসাগরে অমানসিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর উদ্বেগ ও বেদনা প্রকাশ করে তিনি জানান, এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
দেশের ভেতরে দক্ষ জনশক্তি গড়ার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার এমন এক কর্মমুখী ও উৎপাদনমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে যা দেশে কোনো নতুন বেকারের জন্ম দেবে না। মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম প্রধান একটি ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে এবং উচ্চশিক্ষার পেছনে অন্ধভাবে না ছুটে তরুণরা যাতে উন্নত কারিগরি শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়, সে জন্য বৃত্তিমূলক ও টেকনিক্যাল প্রশিক্ষণের পরিধি দেশব্যাপী ব্যাপকভাবে বিস্তার করা হচ্ছে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অতীতে তার কক্সবাজার সফরকালে একটি গাড়ি ব্যবহার নিয়ে সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান সাহেবের করা মন্তব্যের একটি অত্যন্ত স্বচ্ছ জবাব দেন। তিনি সংসদকে জানান যে, বিমানবন্দর এলাকায় নজিরবিহীন ভিড়ের কারণে তার নিজস্ব চারটি গাড়ির কোনোটিই নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাতে না পারায় উপস্থিত সমর্থকদের বিশেষ অনুরোধে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে একটি সাধারণ মাইক্রোবাসে উঠেছিলেন, যা ছিল প্রায় ১৭-১৮ বছর পুরোনো এবং ঘটনাচক্রে ওই গাড়ির মালিক ছিলেন তার নিজের নির্বাচনী এলাকারই একজন সাধারণ বাসিন্দা।
কোনো বিতর্কিত বা বিশেষ ব্যক্তির গাড়িতে তিনি স্বেচ্ছায় ওঠেননি দাবি করে মন্ত্রী বলেন, এই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য তিনি আগেই জনগণের সামনে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন এবং এই অনভিপ্রেত মন্তব্যটি সংসদের মর্যাদা রক্ষার্থে কার্যবিবরণী থেকে বাদ বা এক্সপাঞ্জ করার জন্য তিনি স্পিকারের প্রতি অনুরোধ জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় সংসদে একটি সুস্থ, সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ ও গঠনমূলক আলোচনার আবহ ধরে রাখার জন্য সকল দলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, দেশের সার্বিক সার্বভৌমত্ব ও জনগণের মৌলিক স্বার্থে বর্তমান সরকার ও বিরোধী দল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যৌথভাবে কাজ করছে, যার উজ্জ্বল প্রমাণ হিসেবে জাতীয় জ্বালানি সংকটের ওপর গঠিত যৌথ সংসদীয় কমিটির ঐতিহাসিক রিপোর্ট ইতিমধ্যে সংসদে পেশ করা হয়েছে। সংসদ কক্ষের ভেতরে চমৎকার গণতান্ত্রিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলেও রাজপথে বা বাইরের উত্তপ্ত রাজনৈতিক আবহাওয়ায় দলগুলো অনেক সময় তা ভুলে যায়।
কবি মির্জা গালিবের বিখ্যাত উর্দু ও ফারসি কবিতার ঐতিহাসিক ও রূপক উদ্ধৃতি দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব, শান্তি এবং লাল-সবুজের পতাকার স্বার্থে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে হবে, অন্যথায় বিভেদ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি দেশের জন্য কখনো কোনো কল্যাণ বা সমৃদ্ধি বয়ে আনবে না।
এসআর/এমএসএ
