ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা এখন ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। স্টেডিয়ামের গ্যালারি কিংবা টেলিভিশনের পর্দার সীমা ছাড়িয়ে সেই আবেগ পৌঁছে গেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও। রাজধানী ঢাকার সরু গলি, পুরোনো ভবনের দেয়াল, চায়ের দোকান ও পাড়া-মহল্লার আড্ডায় এখন ফুটবল ঘিরেই তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ।
বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে নানা আয়োজন। কোথাও জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা দেখার ব্যবস্থা, কোথাও ভবনের দেয়ালে ফুটবল কিংবদন্তিদের গ্রাফিতি, আবার কোথাও পতাকা ও সাজসজ্জায় ফুটে উঠছে প্রিয় দলের প্রতি সমর্থকদের ভালোবাসা। খুদে ফুটবলপ্রেমীদের মাঠে অনুশীলন এবং চায়ের দোকানে দল নিয়ে তর্ক-বিতর্কও যোগ করেছে এই উন্মাদনায় নতুন মাত্রা।

শনিবার (১৩ জুন) পুরান ঢাকার স্বামীবাগ, টিকাটুলি, লক্ষ্মীবাজার, তাঁতীবাজার ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘুরে দেখা যায়, স্থানীয় তরুণদের উদ্যোগে বিশ্বকাপ ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা আয়োজন। কয়েকটি এলাকায় তৈরি হয়েছে ‘ফিফা গলি’, বসানো হয়েছে ম্যাচ দেখার বড় পর্দা, পাশাপাশি বিভিন্ন ভবনে শোভা পাচ্ছে প্রিয় দলের পতাকা।
স্বামীবাগের ‘ফিফা গলি’
স্বামীবাগের কে এম দাস লেনে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ‘ফিফা গলি’ লেখা একটি ফটক। বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে সাজানো এই গলি এখন স্থানীয়দের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার ফুটবলপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। গলির দেয়ালে আঁকা হয়েছে ফুটবল বিশ্বের কিংবদন্তিদের ছবি। প্রতিদিনই সেখানে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও ধারণ করছেন, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরে দেখছেন এই ফুটবল আয়োজন।

দয়াগঞ্জ থেকে ছোট্ট চাঁদনিকে নিয়ে ফিফা গলি দেখতে এসেছেন আর্জেন্টিনা সমর্থক রুবেল হোসেন। তিনি বলেন, বিশ্বকাপ নিয়ে এবারের আগ্রহটা অন্যরকম। আর্জেন্টিনা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন। দেয়ালের গ্রাফিতিগুলো খুব ভালো লেগেছে। বিশেষ করে নাপোলির জার্সিতে ম্যারাডোনার ছবিটি অসাধারণ।
গালিতে কথা হয় দুই বান্ধবী আঁখি ও শ্যামশ্রীর সাথে। আঁখি আর্জেন্টিনা সমর্থক আর শ্যামশ্রী ব্রাজিলের সমর্থক। আঁখি জানান, গতবারের চ্যাম্পিয়নের ধারাবাহিকতা এবারো ধরে রাখবে আর্জেন্টিনা। আর মেসির এবারই শেষ বিশ্বকাপ। আমি চাই এবারের কাপটা মেসির হাতেই উঠুক। ব্রাজিলের সমর্থক শ্যামশ্রী জানান, ব্রাজিল পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। পূর্বের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবারের কাপ ব্রাজিলের হাতে উঠবে।

ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দা ইয়াসিন আরাফাত বলেন, এলাকার সবাই মিলে ২০২২ সাল থেকে এই উদ্যোগ শুরু করেছি। সামনে আরও বড় পরিসরে দেয়াল গ্রাফিতির কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পুরান ঢাকার ফুটবলপ্রেমীদের বিশ্বকাপের আবহের সঙ্গে যুক্ত করাই আমাদের উদ্দেশ্য।
খুদে ফুটবলপ্রেমীদের উচ্ছ্বাস
বিশ্বকাপের আবহে পুরান ঢাকার গলিগুলোতেও দেখা যাচ্ছে খুদে ফুটবলপ্রেমীদের ব্যস্ততা। সকাল-বিকেল ফুটবল হাতে ছোটোদের অনুশীলন, ড্রিবলিং ও খেলাধুলা যেন উৎসবের অংশ হয়ে উঠেছে। কারও গায়ে আর্জেন্টিনার জার্সি, আবার কেউ সমর্থন করছে ব্রাজিলকে। ছয় বছর বয়সী তৌফিক হোসেন বাবার সঙ্গে এসেছিল ফিফা গলি দেখতে। তৌফিক বলে, আজ স্কুল বন্ধ। তাই বাবার সঙ্গে এখানে এসেছি। ফুটবল নিয়ে খেলব। বাবা গোলকিপার থাকবে, আমি গোল দেব।

লালবাগ থেকে গুলিস্তানে জার্সি কিনতে এসেছেন ৮ বছর বয়সি মারুফ ও শাকিল। তারা দুইজনেই আর্জেন্টিনার সমর্থক। মারুফ মেসির ভক্ত, তাই মেসির নাম খোদাই করা জার্সি খুঁজছে বিভিন্ন দোকানে। পরে ফুটপাতের একটি দোকান থেকে ৩০০ টাকায় একটি জার্সি পেয়ে আনন্দে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
জায়ান্ট স্ক্রিনে বিশ্বকাপের আমেজ
পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার, রায় সাহেব বাজার, নারিন্দা ও টিকাটুলির বিভিন্ন এলাকায় বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করা হয়েছে। একই ধরনের আয়োজন দেখা গেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকাতেও।
খেলা দেখতে আসা শিক্ষার্থী ইশতিয়াক বলেন, বড় পর্দায় বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখার অনুভূতি আলাদা। একসঙ্গে খেলা উপভোগ করা যায়, দল নিয়ে আলোচনা করা যায়। পুরো বিষয়টি আনন্দের।

চায়ের আড্ডায় ফুটবল বিতর্ক
বিশ্বকাপ এলেই ঢাকার চায়ের দোকানগুলো হয়ে ওঠে ফুটবল আলোচনা ও বিশ্লেষণের কেন্দ্র। নারিন্দার ঋষিকেশ দাস লেনের একটি চায়ের দোকানে দেখা যায় ব্রাজিল ও জার্মানি সমর্থকদের জমজমাট আলোচনা। রিকশাচালক কবির ব্রাজিলের সমর্থক, আর হাফিজ সমর্থন করেন জার্মানিকে। কাজের ফাঁকে ছোট টেলিভিশনে খেলা দেখা এবং প্রিয় দলের পক্ষে যুক্তি দেওয়াই তাদের নিয়মিত আড্ডার অংশ।

জার্মানি সমর্থক হাফিজ বলেন, ২০১৪ সাল থেকে জার্মানিকে সমর্থন করি। ওই বছর তারা বিশ্বকাপ জিতেছে এবং ব্রাজিলকে সাত গোল দিয়েছিল। আশা করি এবারও ভালো করবে। অন্যদিকে ব্রাজিল সমর্থক কবির বলেন, এবার ব্রাজিলই কাপ নেবে। জার্মানি এবার বেশি দূর যেতে পারবে না।
এমএল/এসএএস/এমএন

